বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক কার্টুনুস: আমি যেদিকে হাত দেই সেদিকেই কেন সমস্যা? আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ১২টা হাতি কেন মরে গেল? বনের হাতিরা কেন বারবার মারা পড়ছে? তাদের মনে কি কোনো দুঃখ আছে? তারা কি ডিপ্রেশনে ভুগছে? তাদের কি আত্মবিশ্বাসের অভাব? এমন হাজারো জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন মাথায় নিয়ে গত বুধবার বন ভবনে আয়োজিত ‘বিশ্ব হাতি দিবস’ সেমিনারে হাজির হয়েছিলেন পরিবেশ, বন, জলবায়ু ও আগডুম বাগডুম মন্ত্রণালয়ের সর্বেসর্বা উপদেষ্টা, ‘সেমিনারই সকল সমস্যার সমাধান’ তত্ত্বের জননী এবং বেলার অবৈতনিক মুখপত্র সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
এবারের সেমিনারে তিনি চিরাচরিত কান্নাকাটি বা প্রকল্পের ফিরিস্তি তুলে ধরার মতো বোরিং কাজে যাননি। তিনি ডায়াসে এসেই মাইক্রোফোনটি হাতে নিয়ে এমন এক দৃপ্ত হাসি দিলেন, যেন গত এক বছরে বারোটি হাতি মারা যায়নি, বরং বারোটি হাতি নোবেল পুরস্কার জিতেছে। উপস্থিত জনতার দিকে তাকিয়ে তিনি তার ভাষণ শুরু করলেন, যা শুনে কিছুক্ষণের জন্য গোটা হলরুম স্তব্ধ হয়ে যায়।
উপদেষ্টা বলেন, “বন্ধুগণ, আপনারা অনেকেই শোকাহত। আপনারা ভাবছেন, আমরা বারোটি হাতি হারিয়েছি। আপনাদের এই চিন্তাটাই ভুল! ভুল! ভুল! আসলে আমরা হারাইনি, বরং আমরা পেয়েছি। আমরা পেয়েছি বারোটি অমূল্য কেস স্টাডি। এই বারোটি হাতির মৃত্যু আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে, আমাদের গবেষণার নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে! আমি এবং আমার থিঙ্ক ট্যাঙ্ক রাত-দিন এক করে এই মৃত্যুগুলো নিয়ে গবেষণা করেছি। আমরা বের করেছি, হাতিগুলো চোরাশিকারি, বন উজাড় বা খাদ্যাভাবের মতো বস্তাপচা কারণে মারা যায়নি। তাদের মৃত্যুর কারণ আরও অনেক গভীর, অনেক বেশি সাইকোলজিক্যাল!”
এই বলে তিনি একটি লেজার পয়েন্টার হাতে নিয়ে স্টেজের বিশাল স্ক্রিনের দিকে নির্দেশ করলেন। সেখানে একটার পর একটা হাতির ছবি আসছিল আর উপদেষ্টা তার গবেষণালব্ধ ফলাফল বর্ণনা করছিলেন।
“এই যে দেখুন, আমাদের তদন্ত বলছে, শেরপুরের হাতিটি মারা গেছে চরম কনফিডেন্সের অভাবে। চোরাশিকারি সামনে আসার পর সে ভেবেছিল, আমি কি পারব এর মোকাবেলা করতে? আমার শুঁড় কি যথেষ্ট শক্তিশালী? এই আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির কারণেই সে ভয়ে হার্ট অ্যাটাক করে। চট্টগ্রামের হাতিটি খাদ্যাভাবে মারা যায়নি, সে মারা গেছে ডিসিশন প্যারালাইসিস নামক জটিল মানসিক রোগে। তার সামনে ছিল একটি কাঁঠাল গাছ এবং একটি কলা গাছ। সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না, কোনটা ছেড়ে কোনটা খাবে। এই ‘করব কি করব না’ ভাবতে ভাবতেই তার মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং সে অনাহারে মারা যায়। ভাবুন, কী মর্মান্তিক! আর কক্সবাজারের হাতির মৃত্যুর কারণ আরও অদ্ভুত। সে মারা গেছে ডিপ্রেশন এবং বোরডম থেকে! জীবনে কোনো চ্যালেঞ্জ ছিল না। প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠো, খাও, আর জঙ্গলে হাঁটো। এই একঘেয়ে জীবন তার আর ভালো লাগছিল না। তার কোনো ক্যারিয়ার গোল ছিল না, কোনো মান্থলি টার্গেট ছিল না। ফলে সে জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং স্বেচ্ছায় খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়!”
পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন শেষ করে, বিজয়ীর ভঙ্গিতে এক গ্লাস পানি পান করে রিজওয়ানা হাসান বলেন, “কমিটি-টমিটি, টাওয়ার-ফাওয়ার, আর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে কিছুই হবে না! আমি মূল সমস্যাটা ধরে ফেলেছি!” গোটা হলরুমে তখন পিনপতন নীরবতা। সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে—কী সেই মূল সমস্যা?
উপদেষ্টা টেবিল চাপড়ে বলেন, “মূল সমস্যা হলো হাতিদের মোটিভেশনের অভাব! তাদের মধ্যে ‘পারিব না’ মনোভাব ঢুকে গেছে। তারা জীবনের লক্ষ্য হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ দেখলেই তারা ভাবে, ওরে বাবা, নির্ঘাত মারবে, এই নেতিবাচক চিন্তাই তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে!”
এই যুগান্তকারী আবিষ্কার শুনে হলের মধ্যে বসা বন বিভাগের কর্তারা প্রথমে কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। এরপর সম্বিৎ ফিরতেই এক কর্মকর্তা বলে ওঠেন, “ম্যাডাম, আপনি ঠিকই ধরেছেন! হাতিদের সেলফ-এস্টিম একদম কমে গেছে! তাদের মধ্যে টিমওয়ার্কেরও অভাব, ম্যাডাম! একা একা চলাফেরা করে, তাই বিপদে পড়ে।”
এরপরই উপদেষ্টা তার বক্তব্যকে ক্লাইম্যাক্সের দিকে নিয়ে গিয়ে বলেন, “সুতরাং, আসল সমস্যাটা বাইরে নয়, ভেতরে। হাতিদের হার্ডওয়্যারে নয়, তাদের সফটওয়্যারে। তাদের বনে নয়, তাদের মনে! তাই বন্দুক, বেড়া বা কমিটি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। এর জন্য প্রয়োজন এক মানসিক বিপ্লব! আর সেই বিপ্লব ঘটানোর জন্যই আমাদের ইউনূস সরকার হাতে নিয়েছে এক ঐতিহাসিক মেগা প্রকল্প ‘অপারেশন গজরাজ জাগরণ’! এই প্রকল্পের অধীনে দেশের সকল হাতিকে বাধ্যতামূলকভাবে মোটিভেশনাল ট্রেনিং দেওয়া হবে। এর জন্য দেশের সেরা লাইফ কোচ এবং কর্পোরেট ট্রেইনার, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্পিকার জনাব সোলায়মান সুখনকে প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে!”
এই ঘোষণায় পুরো হলে তুমুল করতালি শুরু হয়। উপদেষ্টা জানান, জনাব সোলায়মান তার টিম নিয়ে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরবেন এবং হাতিদের বোঝাবেন, কীভাবে পজিটিভ থিংকিংয়ের মাধ্যমে চোরাশিকারিদের মোকাবেলা করতে হয়, কীভাবে কলাগাছ দেখলে লোভ সংবরণ করে ডায়েট কন্ট্রোল করতে হয়, এবং কীভাবে শুঁড়কে মাল্টি-পারপাস টুল হিসেবে ব্যবহার করে জীবনে সফলতা আনা যায়। এছারাও হাতিদের জন্য বিশেষ পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন তৈরি করা হবে, যেখানে দেখানো হবে ‘শূন্য থেকে গজরাজ: এক সফল হাতি হওয়ার গল্প’।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ‘অপারেশন গজরাজ জাগরণ’ এর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চারটি পর্বে ভাগ করেন: ১. চ্যালেঞ্জকে বলুন ওয়েলকাম: চোরাশিকারিদের দেখলে ভয় না পেয়ে তাদের সাথে কীভাবে নেগোশিয়েট করতে হয়, তার প্রশিক্ষণ। ২. কলা না কাঁঠাল: দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্পোরেট কৌশল। ৩. আমার শুঁড়, আমার শক্তি: আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কর্মশালা। ৪. টিম বিল্ডিং এক্সারসাইজ: একসাথে থেকে কীভাবে বিপদ মোকাবেলা করা যায়, তার উপায়।
এসময় মঞ্চে উঠে আসেন জনাব সোলায়মান সুখন। তিনি বলেন, “হাতি একটি বিশাল প্রাণী, তার মনও বিশাল। কিন্তু সেই মনে জমেছে হতাশার মেঘ। আমি তাদের শেখাব ‘আই ক্যান, আই উইল’ মন্ত্র। প্রতিটি হাতি যখন সকালে ঘুম থেকে উঠে শুঁড় উঁচিয়ে বলবে ‘আজ একটি অসাধারণ দিন’, সেদিনই আমাদের বন বাঁচবে!” তিনি আরও জানান, প্রশিক্ষণের শেষে সেরা পারফর্ম করা হাতিকে ‘এলিফ্যান্ট অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কার এবং এক বছরের জন্য বিনামূল্যে কলা গাছ সরবরাহ করা হবে।
সেমিনার শেষে দেখা গেল, বন বিভাগের কর্মকর্তারা অত্যন্ত উত্তেজিত। তারা এখন বন্দুক বা টহল বাদ দিয়ে জঙ্গলে জঙ্গলে প্রজেক্টর ও সাউন্ড সিস্টেম বসানোর স্থান খুঁজছেন। আর জনাব সোলায়মান সুখন তার টিমকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে বসেছেন, হাতির ভাষায় ‘সিনার্জি’ ও ‘প্যারাডাইম শিফট’ শব্দ দুটি কীভাবে অনুবাদ করা যায়, তা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে।
#Cartunus Daily, #ইউনূস রেজিম, #ইউনূস সরকার, #কার্টুনুস ডেইলি, #গজরাজ, #ড. মুহাম্মদ ইউনূস, #দৈনিক কার্টুনুস, #পজিটিভ থিংকিং, #পরিবেশ উপদেষ্টা, #পরিবেশ বিপর্যয়, #ফ্যাসিস্ট সরকার, #বন মন্ত্রণালয়, #বন্যপ্রাণী, #ব্যঙ্গাত্মক রচনা, #যেদিকে হাত দেই সেদিকেই সমস্যা, #রম্য রচনা, #রাজনৈতিক রম্য, #রাজনৈতিক স্যাটায়ার, #রিজওয়ানা হাসান, #লাইফ কোচ, #সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, #সোলায়মান সুখন, #স্যাটায়ার, #হাতি মৃত্যু, #হাতি রক্ষা, #হাতির মৃত্যু