বাউলদের ওপর হামলা নিয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিস্ফোরক কলাম

বাউলদের ওপর হামলা নিয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিস্ফোরক কলাম। Mostofa Sarwar Farooki's Explosive Column on the Attacks Against Bauls. বাউলদের ওপর হামলা নিয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিস্ফোরক কলাম। Mostofa Sarwar Farooki's Explosive Column on the Attacks Against Bauls.

সাম্প্রতিক সময়ে বাউলদের ওপর হামলা নিয়ে নীরবতা ভাঙলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তার বক্তব্যে সমবেদনার বদলে মিলল ভাঙচুরের পক্ষে সাফাই।

মতামত, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী: সরকারে যোগ দেয়ার পর গত চারটা দিন ছিলো আমার জন্য আক্ষরিক অর্থেই সিনেমাটিক। একটা থ্রিলার মুভির ক্লাইম্যাক্সের মতো উত্তেজনা, সাসপেন্স আর অ্যাকশনে ভরপুর। অনেকেই আমাকে ইনবক্সে নক করে, কমেন্ট সেকশনে এসে বলছেন, “ভাই, আপনি চুপ কেন? বাউলদের পেটাচ্ছে, মাজার ভাঙছে, আপনি কিছু বলেন না কেন?” আমি তাদের রিপ্লাই দেই না, মনে মনে হাসি। আরে ভাই, আমাদের কাজ তো কাজ করা, আর পাবলিকের কাজ হলো সেই কাজ দেখে হা করে থাকা। সরকারে বসে কি আমি বিবৃতি দিবো? আমি তো ডিরেক্টর, আমি সিন সাজাবো, আর স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী অ্যাকশন হবে। তবুও পাবলিকের এই নাদানপনা দেখে মনে হচ্ছে, ফর দ্য রেকর্ড কিছু কথা ক্লিয়ার করা দরকার। তবে আগেই বলে রাখি, আমার এই কথাগুলো সাধারণ আমজনতার জন্য না, যারা ‘হাই থট’ বা ‘মেটাফোর’ বোঝে না, তারা দয়া করে দূরে গিয়ে পোগো চ্যানেল দেখুন।

প্রথমেই আসি বাউলদের ওপর তথাকথিত হামলার বিষয়ে। আপনারা এটাকে ‘হামলা’ বলছেন, আমি এটাকে বলছি ‘ইন্টার‍্যাক্টিভ পারফর্মিং আর্ট’। দেখুন, যুগ বদলাচ্ছে। একতারা-দোতারা বাজিয়ে ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’ গাওয়ার দিন শেষ। এখন যুগ হলো অ্যাকশনের। বাউলরা গান গাইবে, আর একদল এনার্জেটিক তরুণ এসে তাদের ইনস্ট্রুমেন্ট ভেঙে দিয়ে একটা ড্রামাটিক সিচুয়েশন ক্রিয়েট করবে, এটাই তো মডার্ন আর্ট! আপনারা শুধু ভাঙচুরটাই দেখলেন, এর পেছনের ফিলোসফিটা বুঝলেন না। এই যে বাউলদের চুল কেটে দেয়া হচ্ছে, এটা কি শুধুই চুল কাটা? না! এটা হলো তাদের আউটলুক চেঞ্জ করে স্মার্ট করার একটা সরকারি প্রজেক্ট। আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলেছি। তারা আমাকে একটা এক্সক্লুসিভ ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়েছে। ক্লিপটা দেখে আমি মুগ্ধ! ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন লোক অত্যন্ত ডেডিকেশনের সাথে একটা মাজারের দেয়াল ভাঙছে। তাদের ঘাম ঝরছে, চোখেমুখে একটা বিপ্লব বিপ্লব ভাব। এই দৃশ্য দেখে আমার মনে হয়েছে, দিস ইজ ইট! দিস ইজ দ্য স্পিরিট অফ নিউ বাংলাদেশ। আমরা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে এই ভাঙচুরকারীদের জন্য খুব শীঘ্রই একটা কর্মশালা আয়োজন করবো, যার নাম দিবো, ‘হাতুড়ি ও সংস্কৃতি: বিনির্মাণের নান্দনিকতা’।

অনেকে অভিযোগ করছেন, বাউল আবুল সরকারকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। আরে ভাই, গ্রেফতার তো একজন শিল্পীর জন্য অস্কার পাওয়ার মতো ব্যাপার! জেলে না গেলে কি বড় শিল্পী হওয়া যায়? আপনারা ইতিহাস দেখেন না? নজরুলের জেল হয়েছে, দস্তয়েভস্কির জেল হয়েছে। এখন আবুল সরকার যদি জেলের ভাত না খায়, তাহলে তার গানে সেই দরদ আসবে কোত্থেকে? পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে আসলে তার ক্যারিয়ারের গ্রাফটাকেই উপরে তুলে দিয়েছে। আমি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে ফোন করে থ্যাঙ্কস দিয়েছি। বলেছি, “বস, দারুণ কাস্টিং! পারফেক্ট টাইমিং!” স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে এই স্ক্রিপ্টটা হ্যান্ডেল করছে। আমি বা আমার মন্ত্রণালয় এখানে জাস্ট প্রডিউসারের ভূমিকায় আছি, ডিরেকশন দিচ্ছে পাবলিক সেন্টিমেন্ট। মনে রাখতে অনুরোধ করবো, “স্বাভাবিক আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি” আর “মাজার ভাঙা”, দুটোই এখন সমার্থক শব্দ। আর আমি এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝে দাঁড়িয়ে একটা অদ্ভুত রোমান্টিসিজম অনুভব করছি।

এবার আসি আমার সমালোচকদের কথায়। কিছু ইন্টারেস্টিং প্যাটার্ন লক্ষ্য করছি। একদল লোক, যারা নিজেদের খুব কালচারাল মনে করে, তারা বলছে, ফারুকী মাজার ভাঙাকে জাস্টিফাই করছে! হাহাহাহা। ভেরি ফানি। আরে ভাই, আমি তো জাস্টিফাই করছি না, আমি সেলিব্রেট করছি! আপনারা বলছেন ইনক্লুসিভ রাজনীতির কথা। ইনক্লুসিভ মানে কি জানেন? ইনক্লুসিভ মানে হলো, বাউলও থাকবে, আবার বাউলকে পিটানোর লোকও থাকবে। সমাজে ব্যালেন্স থাকতে হবে তো! যদি সবাই শুধু গানই গায়, তাহলে হাতুড়িটা চালাবে কে? হাতুড়িওয়ালাদেরও তো একটা সংস্কৃতি আছে, নাকি? তাদের সেই সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ করে দেয়াটা কি আমার দায়িত্ব না? আপনারা একপাক্ষিক চিন্তা করেন। আপনারা শুধু বাউলের কান্না দেখেন, কিন্তু মাজার যে ভাঙে, তার মনের আনন্দটা দেখেন না। আমি সংস্কৃতি উপদেষ্টা হিসেবে দুই পক্ষের ইমোশনকেই রেস্পেক্ট করি। তবে হ্যাঁ, যারা ভাঙছে, তাদের এনার্জি লেভেলটা একটু হাই, তাই তারা স্ক্রিনে ফুটেজ বেশি পাচ্ছে। এটা তো ন্যাচারাল সিলেকশন!

আমার কিছু বন্ধু, যারা কমন সার্কেলে আড্ডা দেয়, তারা বলছে, ফারুকী নাকি ইতিহাস গায়েব করে দিচ্ছে! আরে ভাই, ইতিহাস কি কোনো স্ট্যাটিক বিষয়? ইতিহাস হলো একটা ড্রাফট স্ক্রিপ্ট, যা সময়মতো এডিট করতে হয়। আমরা এখন এডিটিং প্যানেলে বসেছি। যেসব সিন আমাদের পছন্দ হচ্ছে না, যেমন ধরেন মাজার সংস্কৃতি, বাউল গান, অসাম্প্রদায়িকতা, এগুলো আমরা ট্রিম করে দিচ্ছি। এডিটিং টেবিলে বসে মায়া দেখালে চলে না। কাঁচি চালাতে হয় নির্দয়ভাবে। একদল তরুণ গবেষক এখন কাঁচি হাতে নেমেছে। তারা যাচাই-বাছাই করে দেখছে কোনটা রাখা যাবে আর কোনটা ডিলিট করতে হবে। আপনারা এটাকে বলছেন ‘ইনটেলেকচুয়াল কলোনি’, আমি এটাকে বলছি ‘ইনটেলেকচুয়াল ফিল্টারিং’। বাংলাদেশকে আমরা এমন একটা ক্লিন স্লেট বানাতে চাই, যেখানে শুধু আমাদের এপ্রুভ করা ন্যারেটিভটাই চলবে। এতে যদি আপনাদের আনকমফোরটেবল লাগে, তো লাগুক। আই অ্যাম সরি টু মেক ইউ ফিল আনকমফোরটেবল, বাট ট্রাস্ট মি, ফিউচার ইজ ব্রাইট অ্যান্ড ব্রোকেন!

অনেকে বলছে, ‘মন্ত্রণালয় লালন সেলিব্রেট করে আর বাউল মারে! ভণ্ডামি!’ এই অভিযোগটা শুনে আমি হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিলাম। আরে ভাই, লালন কি বেঁচে আছেন? নাই। মৃত লালনকে সেলিব্রেট করা সেইফ। কিন্তু জীবিত বাউলরা তো রিস্কি! তারা কখন কি গান গেয়ে ফেলে, পাবলিকের সেন্টিমেন্টে আঘাত লাগে, তার কি ঠিক আছে? তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মৃত লালনকে আমরা জাতীয়ভাবে মাথায় তুলে নাচবো, আর জীবিত বাউলদের সাইজ করবো। এটাই হলো আমাদের স্ট্র্যাটেজি। আমরা বাউলদের ওপর যে হামলাগুলো হচ্ছে, সেগুলোকে দেখছি ‘কালচারাল পিউরিফিকেশন’ হিসেবে। আমরা কাজে বিশ্বাসী, হাফ-হার্টেড কোনো কিছুতে না।

আর সবচেয়ে হাস্যকর অভিযোগ হলো ড্রোন শো নিয়ে। বাউলরা মার খাচ্ছে, আর ফারুকী ড্রোন শো করছে! আরে ভাই, ড্রোন শো হলো টেকনোলজি, আর বাউল গান হলো এনালগ। এনালগ থেকে ডিজিটালে শিফট করতে হবে না? আপনারা কি চান আমরা সারাজীবন ওই একতারা হাতে বসে থাকি? আমার বন্ধু ডরোথি ওয়েনার, যার বাবা বার্লিন ওয়াল ভাঙার সময় চোখের সামনে বার্বি ডল দেখে মেয়ের চোখ ঢেকে দিতো, সে আমাকে বলেছিল, “ফারুকী, লাইট ইজ দ্য ফিউচার।” আমি সেই ফিলোসফিটা অ্যাপ্লাই করছি। মাজারের মোমবাতি নিভে যাক, ড্রোনের এলইডি জ্বলুক! বাউলের দোতারার তার ছিঁড়ে যাক, ড্রোনের প্রপেলারের শব্দে আকাশ কেঁপে উঠুক! এটাই তো স্মার্ট বাংলাদেশ। ড্রোনাতংকে ভোগা বন্ধুদের বলি, আপনারা ব্যাকডেটেড। আপনারা এখনো মাটির গন্ধে আটকে আছেন, আর আমরা আকাশে উড়ছি।

ধরেন, কোথাও বাউল গানের আসর ভেঙে দেয়া হলো। এখন আমার কি করা উচিত? আমি কি সেখানে গিয়ে কাঁদবো? নাকি আমি সেখানে আরও বড় সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া করে ডিজে পার্টির আয়োজন করবো? আমার লজিক বলে, গান যখন বন্ধ হয়েছে, তখন সেখানে নতুন কোনো শব্দ তৈরি করতে হবে। আর ভাঙচুর করার শব্দের চেয়ে মধুর শব্দ আর কি হতে পারে? ক্র‍্যাশ! বুম! ব্যাং! দিস ইজ দ্য মিউজিক অফ দ্য নিউ ইরা। আপনারা যারা বাউলদের ওপর হামলা নিয়ে চিল্লাচিল্লি করছেন, তারা আসলে আর্ট বোঝেন না। একটা মাজার যখন গুঁড়িয়ে দেয়া হয়, তখন যে ধুলো ওড়ে, সেই ধুলোর মধ্যে আমি ভ্যান গঘের পেইন্টিং দেখতে পাই। আপনারা দেখেন ধুলো, আমি দেখি আর্ট। এই ভিশনারি চোখ সবার থাকে না।

সবশেষে বলি, আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সবাইকে ধৈর্য এবং সংযম প্রদর্শন করতে বলছি না, বরং আমি বলছি, এনজয় দ্য শো! বাউলদের ওপর হামলা, মাজার ভাঙা, শিল্পীদের জেলে যাওয়া, সবই এই গ্রেট স্ক্রিপ্টের অংশ। আমরা একটা গ্র্যান্ড ফিনালে-এর দিকে যাচ্ছি। ধর্মীয় এবং সামাজিক সম্প্রীতি তখনই আসবে, যখন সব ভিন্নমতকে আমরা সফলভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারবো। অন্য কিছু কেবল কনফিউশন বাড়াবে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে এই ‘ভাঙার গান’ গাই। কারণ, গড়ার চেয়ে ভাঙার মজাই আলাদা। আর হ্যাঁ, সামনে আমাদের মন্ত্রণালয় আরও আনকমফোরটেবল কাজে হাত দিবে। হয়তো আমরা ঘোষণা দিবো, গান গাওয়া নিষিদ্ধ, শুধু হামিং করা যাবে। অথবা মঞ্চনাটক করা নিষিদ্ধ, শুধু টিকটক করা যাবে। প্রস্তুত থাকুন, কারণ সারপ্রাইজ আসছে!

#, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *