৪৭-এর তথাকথিত বিজয়কে মুখ্য ও ৭১-কে গৌণ করার চেষ্টা? ফাতিমা তাসনিম জুমার বিতর্কিত স্ট্যাটাস ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া নিয়ে পড়ুন বিশেষ প্রতিবেদন।
বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: ইতিহাস বড়ই গোলমেলে বিষয়। একেকজন একেকভাবে ইতিহাস দেখেন। কেউ দেখেন চশমা দিয়ে, কেউ দেখেন দূরবীন দিয়ে, আবার কেউ কেউ ইতিহাস দেখেন নিজের পারিবারিক অ্যালবামের পুরনো দাদাজানদের লেন্স দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমার সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ ফেইসবুক স্ট্যাটাসটি যেন সেই পারিবারিক লেন্সেরই এক দুর্দান্ত প্রদর্শনী। তিনি আমাদের জানিয়ে দিলেন, আসল বিজয় তো এসেছিল ১৯৪৭ সালেই! ১৯৭১ সাল তো কেবল একটি ‘ঘটনা’ মাত্র, যেখানে ‘সহস্র’ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। ত্রিশ লক্ষ শহীদের বিশাল সংখ্যাটিকে তিনি কী নিপুণভাবে ‘ডিসকাউন্ট’ দিয়ে সহস্রের কোঠায় নামিয়ে এনেছেন, তা দেখে বড় বড় গণিতবিদরাও লজ্জায় ক্যালকুলেটর লুকিয়ে ফেলছেন।
ডাকসুর এই মহীয়সী নেত্রী, যাকে আমরা আদর করে ‘জুমা বৌদি’ বলে ডাকতে পারি, তিনি বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে এমন এক ঐতিহাসিক বয়ান পেশ করলেন, যা পড়ে মনে হলো আমরা ভুল করে টাইম মেশিনে চড়ে পাকিস্তান আমলে ফিরে গেছি। তার মতে, ১৯৪৭ সালেই আমরা ‘বহুল কাঙ্ক্ষিত’ বিজয় পেয়েছিলাম। আহা! কী চমৎকার কথা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পর আমরা যে কী সুখে ছিলাম, তা তো কেবল ইতিহাসই জানে। তবে জুমা বৌদির স্ট্যাটাস পড়ে মনে হচ্ছে, তার মনে সেই ৪৭-এর লাড্ডুর স্বাদ এখনো লেগে আছে। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি যে বাঙালিকে তেইশ বছর ধরে শোষণ করল, তা তার কাছে হয়তো ‘ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি’ মনে হয়েছে। তাই তো তিনি সযত্নে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি এড়িয়ে গেছেন। পাছে শব্দটি লিখলে তার ফেইসবুক আইডির পবিত্রতা নষ্ট হয়ে যায়!
সাধারণ শিক্ষার্থীরা, যারা এখনো ১৯৭১ সালকে মুক্তিযুদ্ধের বছর এবং ১৬ ডিসেম্বরকে চূড়ান্ত বিজয়ের দিন হিসেবে জানে, তারা এই স্ট্যাটাস দেখে যারপরনাই অবাক। তারা জুমা বৌদিকে প্রশ্ন করছে, ‘বৌদি, পাকিস্তান শব্দটা লিখতে কি আপনার আঙুল ব্যথা করে? নাকি কি-বোর্ডে ওই অক্ষরগুলো নেই?’ জুমা বৌদি অবশ্য এসব প্রশ্নের তোয়াক্কা করেন না। তিনি পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন, ‘নাম উল্লেখ না করলে কি বোঝা যায় না?’ অবশ্যই যায় বৌদি। যেমন চোরের মায়ের বড় গলা দেখলে বোঝা যায় তিনি কার মা, তেমনি ১৯৭১-এর কথা বলতে গিয়ে যারা পাকিস্তানের নাম নিতে লজ্জা পায়, তাদের আসল পরিচয়ও জাতি বুঝে ফেলে।
গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, এই যে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি এড়িয়ে যাওয়া, এটি আসলে একটি বিশাল প্রকল্পের অংশ। একে বলা যেতে পারে ‘ইতিহাসের সফটওয়্যার আপডেট’। এই আপডেটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ধীরে ধীরে ঝাপসা করে দেওয়া হবে। সেখানে হানাদার বাহিনীর কোনো নাম থাকবে না, থাকবে শুধু ‘শোষণের অন্ধকার’। যেন আকাশ থেকে হঠাৎ অন্ধকার নেমে এসেছিল, আর আমরা সেই অন্ধকারের সঙ্গে যুদ্ধ করে জিতে গেলাম। কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ? বলা যাবে না। কারা ৩০ লক্ষ বাঙালীকে হত্যা করেছিল? বলা যাবে না। শুধু বলতে হবে, ‘কিছু লোক গাদ্দারি করেছিল’। এই গাদ্দার কারা? বৌদির লজিক অনুযায়ী, হয়তো তারা ভিনগ্রহের প্রাণী ছিল।
জুমা বৌদির লেখায় আরেকটি ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো শহীদের সংখ্যাতত্ত্ব। তিনি লিখেছেন ‘সহস্র শহীদ’। আচ্ছা, ত্রিশ লক্ষ আর সহস্রের মধ্যে যে বিশাল ফারাক, তা কি বৌদির জানা নেই? নাকি তিনি মনে করেন, এত বড় সংখ্যা বললে নতুন প্রজন্মের অংকে গোলমাল লেগে যাবে? তাই সুবিধার্থে কমিয়ে বললেন? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গূঢ় রহস্য আছে? অনেকে বলছেন, বৌদির মনের গভীরে যে আদর্শ লালিত হচ্ছে, সেই আদর্শে বিশ্বাসী মানুষেরা কখনোই ত্রিশ লক্ষ শহীদের সংখ্যা মেনে নিতে পারেনি। তাদের কাছে ৭১-এর শহীদরা কেবলই ‘দুষ্কৃতকারী’ বা ‘সংখ্যায় নগণ্য’। বৌদির কলম দিয়ে অবচেতনভাবে হয়তো সেই পারিবারিক বা আদর্শিক সত্যটাই বেরিয়ে এসেছে। একেই বলে, রক্ত কথা বলে। ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট হয়তো ল্যাবরেটরিতে পাওয়া যায়, কিন্তু মনের ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট পাওয়া যায় ফেইসবুক স্ট্যাটাসে।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন এই ইতিহাস বিকৃতির প্রতিবাদে ফেটে পড়ল, তখন ফাতিমা তাসনিম জুমা নতুন যুক্তি নিয়ে হাজির হলেন। তিনি বোঝাতে চাইলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সঙ্গে ১৯৭১-কে মিলিয়ে তিনি একাকার করে দিতে চান। তার মতে, ২০২৪ আমাদের সামনে ‘রাষ্ট্র-আকাঙ্ক্ষা’ পূরণের সুযোগ এনে দিয়েছে। অর্থাৎ, ১৯৭১ সালে যা হয়েছিল, তা যথেষ্ট ছিল না, বা সেটা তেমন কোনো বড় ব্যাপার ছিল না। আসল খেলা তো এখন হচ্ছে। এই যে ৭১-এর গুরুত্ব কমিয়ে ২০২৪-কে হাইলাইট করার চেষ্টা, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। তাদের লক্ষ্য হলো, নতুন প্রজন্মের মগজ থেকে ১৯৭১-এর গরিমা মুছে ফেলা। যদি বলা হয়, ‘সবই তো আন্দোলন, ৭১-ও যা, ২৪-ও তা’, তাহলে এক সময় ৭১-এর বিশেষত্ব আর থাকবে না। তখন রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধার পার্থক্যও ঘুচে যাবে। সবাই হয়ে যাবে ‘আন্দোলনকারী’।
ডাকসুর এই সম্পাদকের বক্তব্যে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি খুঁজতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী অণুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করেছেন, কিন্তু হতাশ হয়েছেন। এত বড় লেখায় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি নেই! আছে শুধু ‘রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ’। কার যুদ্ধ? কাদের যুদ্ধ? এই যে শব্দের মারপ্যাঁচ, এই যে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া, এটা কি কেবলই অনিচ্ছাকৃত ভুল? নাকি এর পেছনে আছে সেই পুরনো এজেন্ডা, যেখানে বাংলাদেশকে আবারও ‘পূর্ব পাকিস্তান’ ভাবার একটা সুপ্ত বাসনা কাজ করে?
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, জুমা বৌদির এই লেখা আসলে একটি ‘টেস্ট কেস’। তারা দেখতে চাইছেন, পাবলিক ঠিক কতটা খায়। যদি এই ‘সহস্র শহীদ’ আর ‘৪৭-এর বিজয়’ তত্ত্ব পাবলিক হজম করে ফেলে, তাহলে আগামীতে হয়তো দেখা যাবে, তারা বলছে ‘আসলে যুদ্ধটা হয়েছিল দুই ভাইয়ের মধ্যে একটু মন কষাকষি নিয়ে। পরে আমরা মিউচুয়াল করে নিয়েছি।’ আর তখন হয়তো বিজয় দিবসে আমরা বিরিয়ানির বদলে হালুয়া খাব, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজবে কাওয়ালি।
জুমা বৌদির এই ‘রাজাকারের নাতনিসুলভ’ আচরণ (এটি একটি মেটাফোর, সত্যি নাতনি কিনা তা অনুসন্ধানের বিষয়) আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইতিহাস বিকৃতির এই প্রজেক্টটি বেশ শক্তিশালী। তাদের হাতে এখন ক্ষমতা কম থাকতে পারে, তারা হয়তো সরাসরি বলতে পারছে না যে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, কিন্তু তারা ঘুরিয়ে বলছে, ‘৪৭-এর বিজয় জিন্দাবাদ’। তারা সরাসরি বলছে না ‘মুক্তিযুদ্ধ ভুয়া’, কিন্তু তারা বলছে ‘৭১-এর কাজ এখনো শেষ হয়নি, তাই ৭১-এর চেয়ে ২৪ বড়’। এই যে সূক্ষ্ম ব্রেইনওয়াশ, এটা যে কোনো বোমার চেয়েও বিপজ্জনক।
পরিশেষে বলা যায়, এই ফাতিমা তাসনিম জুমারা হয়তো ভাবছেন তারা খুব স্মার্ট। তারা ভাবছেন, ফেইসবুকে দুই-চার লাইন লিখলেই ইতিহাস বদলে যাবে। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন, বাঙালির স্মৃতিশক্তি কিছুটা দুর্বল হলেও, আবেগের জায়গায় আঘাত লাগলে তারা ঠিকই ফুঁসে ওঠে। ৭১-এর চেতনা কোনো ফেইসবুক স্ট্যাটাস নয় যে এডিট অপশনে গিয়ে বদলে দেওয়া যাবে। এটি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের কালিতে লেখা। আর বৌদি, আপনি যতই কালি বাঁচাতে চান না কেন, ‘পাকিস্তান’ শব্দটি না লিখলেও ওই দেশের প্রেতাত্মা যে আপনার লেখার প্রতিটি লাইনে উঁকি দিচ্ছে, তা ঢাকার জন্য যে পরিমাণ টিপেক্স দরকার, তা এখনো বাজারে আসেনি।
#৩ লক্ষ নাকি ৩০ লক্ষ শহীদ, #৩০ লক্ষ শহীদ, #৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ, #৩০ লক্ষ শহীদ বাহুল্য নাকি বাস্তবতা, #৩০ লক্ষ শহীদ বিতর্ক, #৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, #৪৭ এর দেশভাগ, #Cartunus Daily, #ইতিহাস বিকৃতি, #ইতিহাস মুছে ফেলা, #একাত্তরের বদলা, #কার্টুনুস ডেইলি, #ছাত্র আন্দোলন, #জামায়াতে ইসলামীর চক্রান্ত, #ডাকসু, #ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, #দৈনিক কার্টুনুস, #নব্য রাজাকার, #পাকিস্তান প্রীতি, #পাকিস্তান সেনাবাহিনী, #ফাতিমা তাসনিম জুমা, #ফেইসবুক স্ট্যাটাস, #বাংলাদেশ, #বিজয় দিবস, #মুক্তিযুদ্ধ, #মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, #রাজনৈতিক রম্য, #রাজাকার, #রাজাকারের এজেন্ডা, #শহীদদের অপমান, #সহস্র শহীদ, #স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি