সাগরে আগুন আর ডাঙায় হাহাকার – এলএনজির পর এলপিজিও পিটার হাসের পকেটে?

এলএনজির পর এলপিজি: পিটার হাসের বাজার দখলে ড. ইউনূসের নীরব সহায়তা? LPG After LNG: Dr. Yunus's Silent Support in Peter Haas's Market Takeover? এলএনজির পর এলপিজি: পিটার হাসের বাজার দখলে ড. ইউনূসের নীরব সহায়তা? LPG After LNG: Dr. Yunus's Silent Support in Peter Haas's Market Takeover?

১ লাখ কোটি টাকার এলএনজি বাণিজ্যের পর এবার এলপিজিও পিটার হাসের পকেটে ঢোকানোর ষড়যন্ত্র।

বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: দেশজুড়ে গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রান্নাঘরের পরিস্থিতি অনেকটা কুরুক্ষেত্রের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে গৃহিণীরা খুন্তি হাতে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছেন, কিন্তু প্রতিপক্ষ ‘গ্যাস’ নামক বস্তুটিই গায়েব। পাইপলাইনের গ্যাস তো সেই কবেই অভিমান করে আর আসবে না বলে দিয়েছে, আর এখন সিলিন্ডারের গ্যাস যেন অমাবস্যার চাঁদ। সাধারণ জনগণ যখন গ্যাসের দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে হাপিত্যেশ করছে, তখন তাদের পকেট কাটার মহোৎসব চলছে দ্বিগুণ দামে। অথচ, এই হাহাকারের নেপথ্যে যে চিত্রনাট্যটি রচিত হয়েছে, তা কোনো হলিউডি কর্পোরেট থ্রিলার মুভিকেও হার মানাবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটি নিছকই সরবরাহ সংকট বা ডলারের অভাব, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, এই সংকটের ধোঁয়াটা আসলে কোথা থেকে উড়ছে। এই ধোঁয়ার উৎস খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সাগরের বুকে ঘটে যাওয়া কিছু ‘রহস্যময়’ অগ্নিকাণ্ড এবং একজন সাবেক কূটনীতিকের ‘ব্যবসায়ী’ হিসেবে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের দিকে।

২০২৪ সালের অক্টোবরের সেই ভয়াল রাতগুলোর কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? ১৩ অক্টোবর মধ্যরাতে বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া অংশে যেন আগুনের উৎসব লেগেছিল। এলপিজি বহনকারী বিদেশি মাদার ভ্যাসেল ‘এমভি নিকোলাস’ এবং বাংলাদেশি লাইটার জাহাজ ‘সোফিয়া’ দুটিতেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। নৌবাহিনীর পাঁচটি জাহাজের দুদিন লাগল সেই আগুন নেভাতে। এর ঠিক কিছুদিন আগেই, ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ‘বাংলার সৌরভ’ এবং তারও আগে ৩০ সেপ্টেম্বর ডলফিন জেটিতে ‘বাংলার জ্যোতি’ নামের জাহাজে আগুন লাগে। মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে চারটি তেল ও এলপিজি বহনকারী জাহাজে আগুন! একে কি শুধুই দুর্ঘটনা বলা চলে? নাকি এর পেছনে ছিল কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার নীল নকশা? বার্তাটা পরিষ্কার “দেশীয় ব্যবস্থাপনায় গ্যাস আনা নিরাপদ নয়, তোমাদের জাহাজে আগুন লাগে, তোমরা অযোগ্য।” আর যখনই এই ‘অযোগ্যতা’ প্রমাণ করা যাবে, তখনই ‘নিরাপদ’ জ্বালানি সরবরাহের ধুয়া তুলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য এলপিজি আমদানির দুয়ার অবারিত করা হবে। আমজনতা যখন আগুনের তাপে দিশেহারা, তখন পর্দার আড়ালে হয়তো কেউ মুচকি হাসছিলেন। আর সেই হাসির সাথে যদি কোনো সাবেক প্রভাবশালী কূটনীতিকের নামের মিল খুঁজে পান, তবে দোষ আপনার কল্পনার নয়, দোষ পরিস্থিতির।

এই পরিস্থিতির ‘নাটের গুরু’ হিসেবে মঞ্চে যার পুনরাগমন ঘটেছে, তিনি আর কেউ নন, একদা ঢাকার বুকে ছড়ি ঘোরানো সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস। জুলাই ষড়যন্ত্রের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যার চাকুরির মেয়াদ শেষ হয়েছিল, সেই তিনি আবার ফিরে এসেছেন। তবে এবার আর কূটনীতিকের বেশে নয়, এবার তিনি এসেছেন পুরোদস্তুর ‘ব্যবসায়ী’ বেশে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি বাংলাদেশে পা রাখলেন ‘এক্সিলারেট এনার্জি’র কৌশলগত উপদেষ্টা হিসেবে। এসেই তিনি সোজা চলে গেলেন কক্সবাজারের মহেশখালীতে, যেখানে তার নতুন কোম্পানির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল অবস্থিত। যেন নিজের জমিদারির তদারকি করতে এসেছেন। আর কাকতালীয়ভাবে, তার এই আগমনের বাদ্য বাজতে না বাজতেই সাগরের বুকে এলপিজি ও তেলবাহী জাহাজগুলোতে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা গেল। এলএনজির কন্ট্রাক্ট তো কনফার্ম, এখন এলপিজির সাপ্লাই চেইন ভেঙে দিয়ে কৃত্রিম হাহাকার তৈরি করলে, জনগণই বাধ্য হয়ে বলবে, “বাবা পিটার, তুমিই গ্যাস আনো, তাও আমাদের বাঁচাও।” আর সেই সুযোগেই হয়তো এলএনজির মতো এলপিজির একচেটিয়া লাইসেন্সও চলে যাবে ওই একই সিন্ডিকেটের হাতে।

অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে গোপন বা প্রকাশ্য—যে চুক্তিই হোক না কেন, পিটার হাসের তত্ত্বাবধানে থাকা মার্কিন কোম্পানিটি আগামী ১৫ বছরে ধাপে ধাপে বাংলাদেশে ১ লাখ কোটি টাকার এলএনজি সরবরাহ করবে বলে ইতিমধ্যেই পাকা কথা হয়ে গেছে। টাকার অঙ্কটা শুনে কি মাথা ঘুরছে? ঘোরারই কথা। ২০২৬ সাল থেকে শুরু হবে এই মহাযজ্ঞ, চলবে টানা ১৫ বছর। আর আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার ক্ষেত্রেও এই মার্কিন কোম্পানিটিকেই ‘জামাই আদর’ করে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিযোগিতার বালাই নেই, পুরোটাই একচ্ছত্র আধিপত্য।

অনেকে হয়তো ভুরু কুঁচকে বলতে পারেন, “আরে ভাই, পিটার হাসের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি তো এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ করে, আর এখন দেশে চলছে এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডারের সংকট। দুটোর সম্পর্ক কী?” সাদা চোখে দেখলে সম্পর্ক নেই, কিন্তু বাঘের কাছে যেমন হরিণ আর ছাগল উভয়েই কেবল ‘মাংস’, তেমনি সাম্রাজ্যবাদী বেনিয়াদের কাছে এলএনজি আর এলপিজি। উভয়েই কেবল ‘ডলার’। এলএনজির ১ লাখ কোটি টাকার বিশাল বাজার তো ইতিমধ্যেই হাস সাহেবের পকেটে ঢুকেছে, কিন্তু ‘ক্ষুধা’ কি তাতে মেটে? এলপিজির বিশাল খুচরা বাজারটা কেন অন্যদের হাতে থাকবে? তাই তো সন্দেহ দানা বাঁধছে, এলএনজির পর এবার এলপিজির মার্কেট একচেটিয়া দখল করতেই কি এই কৃত্রিম সংকটের নাটক সাজানো হচ্ছে? প্রতিযোগীদের জাহাজ পুড়িয়ে, ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দিয়ে সেই শূন্যস্থানে ‘ত্রাতা’ হিসেবে আভির্ভূত হবে কোনো মার্কিন কোম্পানি? সমীকরণটা কিন্তু খুব একটা জটিল ছিল না।

এলএনজির এই ‘মধু’ খাওয়ার পর মার্কিন শকুনদের নজর কি এলপিজির ‘মৌচাক’-এর দিকে পড়েনি? দেশি জাহাজ পুড়লে, দেশি সরবরাহকারীরা পথে বসলে, আর সাধারণ মানুষ সিলিন্ডারের জন্য হাহাকার করলে, বিদেশি কোম্পানির পোয়াবারো হবেই। এটাই তো মুক্তবাজার অর্থনীতির অমোঘ নিয়ম। হয়তো শীঘ্রই শুনব, “দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলপিজি আমদানির দায়িত্বও কোনো এক মার্কিন কোম্পানিকে দেওয়া হলো।” আর সেই কোম্পানির উপদেষ্টা হিসেবে হয়তো আবার সেই পরিচিত হাসিমুখটাই ভেসে উঠবে।

জনগণ যখন গ্যাসের অভাবে কাঁচা বাজার চিবিয়ে খাওয়ার উপক্রম, তখন আমাদের মহান ‘মহামানব’ ড. ইউনূস কী করছেন? তার কি সময় আছে এই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর? উহু, একদমই না। তার এখন অনেক কাজ, অনেক ব্যস্ততা। গত সতেরো মাসে ক্ষমতায় বসে তিনি যে ‘অসাধ্য’ সাধন করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। জনগণের কষ্ট লাঘব তো দূরের কথা, তিনি ব্যস্ত ছিলেন নিজের ঝুলি ভরতে। গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইসেন্স, গ্রামীণ মোবাইল ওয়ালেটের লাইসেন্স, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসের লাইসেন্স, একের পর এক লাইসেন্স বাগিয়ে নিতেই তার দিন কেটেছে। আর হ্যাঁ, কর মওকুফের বিষয়টি তো ভুললে চলবেই না। গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার কর মওকুফ করে নিয়েছেন তিনি। ৬৬৬ কোটি টাকা! এই টাকায় কত লাখ সিলিন্ডার ভর্তুকি মূল্যে দেওয়া যেত, সেই হিসাব করতে গেলে নীলক্ষেতের টং দোকানি মজিদ মিয়ার ক্যালকুলেটরের ব্যাটারি ফুরিয়ে যাবে।

মহামানব ইউনূস হয়তো ভাবেন, “দেশের মানুষ তো সব বেকুব, ওদের দিকে নজর দেওয়ার কী আছে? ওরা লাইন ধরে গ্যাস কিনবে, দ্বিগুণ দাম দেবে, আর আমি এদিকে নিজের আখের গোছাব।” নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য লাইসেন্স আর কর মওকুফ নিশ্চিত করতে করতেই তার সময় পার, জনগণের হাহাকার শোনার সময় কোথায় এই নোবেল জয়ীর? তিনি হয়তো মনে করেন, নোবেল পুরস্কার তাকে এই লাইসেন্স দিয়েছে যে, তিনি যা খুশি তাই করতে পারবেন। আর তাই, তার আমেরিকান ‘বস’ পিটার হাসের সাথে মিলেমিশে এক অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি করেছেন। একদিকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষকে জিম্মি করা, অন্যদিকে সেই জিম্মি দশার মুক্তিপণ হিসেবে জনগণের পকেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়ার বন্দোবস্ত করা, এ যেন এক নিখুঁত পরিকল্পনা। এলএনজি দিয়ে পকেটমারের শুরু, আর এলপিজি দিয়ে হয়তো তার পূর্ণতা আসবে।

পিটার হাসের কোম্পানি বা তার পছন্দের কোনো মার্কিন গোষ্ঠীকে এলপিজির কাজ পাইয়ে দিতে গিয়ে যদি দেশের মানুষের পেটে লাথি মারতে হয়, তাতে কার কী আসে যায়? সরকার প্রধান যখন নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত, তখন বিদেশি প্রভুরা তো ছড়ি ঘোরাবেই। মাঝখান থেকে বলির পাঁঠা হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তাদের একদিকে গ্যাসের চুলা জ্বলে না, অন্যদিকে মনের ভেতরে ক্ষোভের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে। কিন্তু সেই আগুনের উত্তাপ কি এসি রুমে বসে থাকা মহামানবদের গায়ে লাগে? লাগে না। তারা তখন ব্যস্ত থাকেন নতুন কোনো লাইসেন্স ফাইলে সই করতে অথবা বিদেশি মেহমানদের সাথে কফি খেতে খেতে পরবর্তী কোন খাতটি ‘দখল’ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনায় মগ্ন থাকতে।

অবাক করা বিষয় হলো, এই যে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলা চলছে, তা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। সুশীল সমাজ, যারা বিগত সরকারের আমলে পান থেকে চুন খসলেই টকশোতে ঝড় তুলতেন, তারা এখন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। হয়তো তাদেরও কোনো ‘লাইসেন্স’ বা ‘সুবিধা’র আশা আছে। আর আমজনতা? তারা তো চিরকালই দর্শক। তারা দেখছে কীভাবে তাদের চোখের সামনে দিয়ে ‘সংস্কার’-এর নামে হরিলুট চলছে। এক্সিলারেট এনার্জির সাথে এলএনজির ১ লাখ কোটি টাকার চুক্তি আর সমসাময়িক এলপিজি সংকট, সবই যেন এক সুতোয় গাঁথা। এই চুক্তির কত শতাংশ কমিশন হিসেবে কার পকেটে যাচ্ছে বা এলপিজি মার্কেট দখলের জন্য কত টাকার লেনদেন হচ্ছে, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। কিন্তু সেই গবেষণার ফল প্রকাশের আগেই হয়তো গবেষক নিজেই ‘গুম’ হয়ে যাবেন নোবেল জয়ীর ইশারায়।

শেষমেশ কথা একটাই, সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের স্বার্থ রক্ষার্থেই যে এই গ্যাসের কৃত্রিম সংকট জিইয়ে রাখা হয়েছে, তা বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার দরকার নেই। এলএনজি দিয়ে শুরু, এখন লক্ষ্য এলপিজি, দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানোর মতো সোজা অঙ্ক। আর এই অঙ্কের সমাধান করতে গিয়ে ড. ইউনূস প্রমাণ করে দিলেন, জনগণের সেবক হওয়ার চেয়ে নিজের ও বিদেশি প্রভুদের সেবা করাটাই তার কাছে বেশি লাভজনক। নিজের জন্য লাইসেন্স, কর মওকুফ আর আখের গোছানোর ফাকে ফাকে যদি সময় পান, তবে হয়তো তিনি একবার জানালার পর্দা সরিয়ে দেখবেন, নিচে রাস্তায় গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো কতটা অসহায়। কিন্তু ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে, পুরো দেশটাই হয়তো কোনো বিদেশি কোম্পানির ‘সাবসিডিয়ারি’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। কী বিচিত্র এই দেশ, আর কী বিচিত্র এর ‘মহামানব’ শাসকরা!

#, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *