জামায়াত নেতার কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের প্রতিবাদ করে কেন তোপের মুখে হেমা চাকমা? অন্যদিকে শিশুদের নির্যাতন করেও কীভাবে পার পেয়ে যাচ্ছেন সর্বমূত্র চাকমা?
বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে যখন রাজনীতির গরম ভাপ উড়ছে, ঠিক তখনই অনলাইনের নীল দুনিয়ায় চলছে এক বিচিত্র সাইবার যুদ্ধ। একদিকে জামায়াতে ইসলামীর এক ‘জান্নাতি’ নেতার মুখনিসৃত ‘ডাকসু বেশ্যাখানা’ বাণীর প্রতিবাদ করে তোপের মুখে পড়েছেন ডাকসু সদস্য হেমা চাকমা, আর অন্যদিকে শিশুদের কান ধরে ওঠবস করিয়ে এবং বৃদ্ধদের লাঠিপেটা করেও বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আরেক ডাকসু সদস্য, ভিপি-ঘনিষ্ঠ ‘সর্বমূত্র’ চাকমা। আপাতদৃষ্টিতে এই ঘটনা সাধারণ মানুষের কাছে দ্বিচারিতা বা হিপোক্রেসি মনে হতে পারে। সাধারণ পাবলিক ভাবতেই পারে, একজন নারী প্রতিবাদ করলেই তাকে ‘বেশ্যা’ ট্যাগ দিয়ে ধুয়ে দেওয়া হচ্ছে, অথচ আরেকজন শিশুদের নির্যাতন করেও ‘হিরো’ সেজে বসে আছে, এর বিচার কী? কিন্তু সাধারণ মানুষের এই চিন্তাভাবনা যে কতটা সেকেলে এবং অবৈজ্ঞানিক, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ডাকসুর ভিপি এবং শিবিরের ‘গুপ্ত পুরুষ’ খ্যাত সাদিক কায়েম। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে জাতির সামনে উন্মোচন করেছেন এক যুগান্তকারী তত্ত্ব, যার নাম ‘মওদুদী বায়োলজি ও পলিটিক্যাল ম্যাথমেটিক্স’।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন বরগুনা-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী সুলতান আহমেদের পবিত্র মুখ থেকে নিসৃত হয় যে, ডাকসু নাকি একসময় মাদকের আড্ডা ও বেশ্যাখানা ছিল। এই মন্তব্যের প্রতিবাদে যখন হেমা চাকমা সংবাদ সম্মেলন করলেন, তখন অনলাইনে ঝাঁপিয়ে পড়ল একদল ‘শান্তিকামী’ বট-জনতা। তাদের কিবোর্ডের ঝড়ে হেমা চাকমার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার হতে থাকল। কিন্তু ঠিক একই সময়ে, ডাকসুর আরেক সদস্য সর্বমূত্র চাকমা, যিনি শিশুদের কান ধরে ওঠবস করিয়ে এবং বৃদ্ধদের লাঠিপেটা করে ভাইরাল হয়েছেন, তিনি ভিপির পাশে বসে মুচকি হাসছিলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, ভিপি সাহেব, আপনার সংগঠনের একজন নারী সদস্যকে যখন এভাবে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে, তখন আপনি নিশ্চুপ কেন? আর শিশুদের নির্যাতনকারী এই সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন?
প্রশ্ন শুনে ভিপি সাদিক কায়েম পকেট থেকে একটি তসবিহ এবং একটি সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর বের করলেন। পাশে বসা সর্বমূত্র চাকমার মাথায় হাত বুলিয়ে গালে চুমু খেয়ে তিনি সাংবাদিকদের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকালেন। তিনি বললেন, আপনারা আসলে বিজ্ঞানের কিছুই বোঝেন না। আপনারা মনে করেন সব চাকমা এক? আপনাদের এই জেনারালাইজেশনের প্রবণতাই হলো মূল সমস্যা। বায়োলজি এবং পলিটিক্যাল সায়েন্সের মওদুদী ভার্সন অনুযায়ী চাকমা আসলে দুই প্রকার। এক হলো ‘গুড চাকমা’ বা ভালো চাকমা, আর দুই হলো ‘ব্যাড চাকমা’ বা খারাপ চাকমা। এই ক্লাসিফিকেশন না বুঝলে আপনারা ডাকসুর বর্তমান ডায়নামিক্স কিছুই বুঝবেন না।
ভিপি সাহেব তার তত্ত্বের বিশদ ব্যাখ্যায় যান। তিনি বলেন, এই যে দেখুন আমার পাশে বসে থাকা সর্বমূত্র চাকমা। ইনি হলেন ক্ল্যাসিক উদাহরণ ‘গুড চাকমা’র। কেন তিনি ভালো? কারণ তিনি আমাদের মওদুদী ধর্মে বিশ্বাসী। তিনি জানেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু কোথায়। তিনি বোঝেন যে, ভিপির কথার ওপর কথা বলা যাবে না, বরং ভিপির নির্দেশ পালন করাই হলো পরম ধর্ম। তিনি শিশুদের কান ধরে ওঠবস করিয়েছেন, সেটাকে আপনারা বলছেন নির্যাতন? আরে ভাই, এটা তো নির্যাতন নয়, এটা হলো ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন। শিশুরা ভবিষ্যতে যাতে আমাদের মতো ‘বড় ভাই’দের সম্মান করতে শেখে, তার বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন তিনি। আর বৃদ্ধকে লাঠি দিয়ে পেটানো? ওটা তো ছিল সমাজসেবা। বৃদ্ধ মানুষ, হয়তো ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না, তাই লাঠির স্পর্শে তাকে গতিশীল করার চেষ্টা করছিলেন আমাদের সর্বমূত্র। তার চেয়েও বড় কথা, তিনি আমাদের অনুগত। আমরা যদি বলি এখন দিন, তিনি বলবেন দিন। আমরা যদি বলি রাত, তিনি বলবেন রাত। এই যে নিঃশর্ত আনুগত্য, এটাই তাকে ভালো চাকমায় পরিণত করেছে। তার সাত খুন মাফ, কারণ তিনি আমাদের তরিকায় আছেন।
এরপর ভিপি সাদিক কায়েম তার ক্যালকুলেটরটি সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এবার আসি হেমা চাকমার বিষয়ে। আপনারা তাকে ভিক্টিম বলছেন, কিন্তু গাণিতিক সূত্র কী বলে? তিনি জামায়াত নেতার মন্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন। জামায়াত নেতা যখন বলেছেন ডাকসু বেশ্যাখানা, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে অবশ্যই কোনো আধ্যাত্মিক বা মেটাফিজিক্যাল কারণ আছে। সেই পবিত্র বাণীর প্রতিবাদ করা মানে কি জানেন? মানে হলো আপনি সত্যের বিরুদ্ধে গেলেন, আপনি মওদুদী ধর্মের বিপক্ষে দাঁড়ালেন। আর আমাদের ফিলোসফি অনুযায়ী, যারা আমাদের গুরুজনদের বা আমাদের অ্যালায়েন্সের বিরুদ্ধে কথা বলে, তারা অটোমেটিক্যালি ‘ব্যাড’ ক্যাটাগরিতে পড়ে যায়। হেমা চাকমা যেহেতু প্রতিবাদ করেছেন, তাই তিনি ‘ব্যাড চাকমা’।
তিনি আরও বলেন, এখন আপনারা হিপোক্রেসির অভিযোগ তুলছেন, বলছেন আমরা কেন হেমাকে ডিফেন্ড করছি না। এখানে আমি আপনাদের একটা অংক শেখাই। ছোটবেলায় বীজগণিতে কী শিখেছেন? মাইনাসে মাইনাসে প্লাস, তাই না? হেমা চাকমা হলেন ‘ব্যাড’ অর্থাৎ মাইনাস। তাকে অনলাইনে গালিগালাজ করা হচ্ছে, যেটা আপাতদৃষ্টিতে নেগেটিভ বা মাইনাস। তো, একটা নেগেটিভ মানুষ (হেমা) যখন আরেকটা নেগেটিভ ব্যবহারের (গালি) শিকার হয়, তখন মাইনাসে মাইনাসে রেজাল্ট কী হয়? প্লাস! অর্থাৎ, হেমা চাকমাকে এই যে অনলাইনে ধোলাই করা হচ্ছে, এটা গাণিতিকভাবে একটা পজিটিভ বা ইতিবাচক কাজ। সমাজ থেকে নেগেটিভিটি দূর করার জন্য এই গালিগালাজ অপরিহার্য। আপনারা অংক না বুঝে শুধু শুধু চিল্লাপাল্লা করছেন।
পাশে বসা সর্বমূত্র চাকমা তখন ভিপির কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়ছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, দেখুন, আমি শিশুদের কান ধরে ওঠবস করিয়েছি কারণ তারা খেলার মাঠে ডিস্টার্ব করছিল। ভিপি ভাই যেমনটা বললেন, আমি সিস্টেমের ভেতর আছি, তাই আমার কাজটা হলো শাসন। আর হেমা আপা সিস্টেমের বাইরে গিয়ে কথা বলেছেন, তাই ওটা হলো বেয়াদবি। শাসন আর বেয়াদবি কি এক জিনিস? আপনারা সাংবাদিকরা সব কিছু গুলিয়ে ফেলেন। ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, তাতে কী? আমার নেতা সাদিক কায়েম ভাইয়ের ছায়া যতদিন আমার ওপর আছে, মওদুদী ধর্মের ছাতা যতদিন আমার মাথার উপর আছে, ততদিন আমি ‘গুড’। আর হেমা আপা যতদিন না লাইনে আসছেন, ততদিন তিনি ‘ব্যাড’। সিম্পল ইকুয়েশন।
ভিপির এই ব্যাখ্যার সময় উপস্থিত এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, কিন্তু, একজন নারীকে ‘বেশ্যা’ বলা বা তার চরিত্র হনন করা কি কোনো সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে? জবাবে ভিপি সাদিক কায়েম হেসে বলেন, শব্দের অর্থ নির্ভর করে কে বলছে তার ওপর। আমাদের পক্ষের কেউ যখন কাউকে বেশ্যা বলে, তখন সেটাকে আক্ষরিক অর্থে নেবেন না। সেটা একটা মেটাফোর বা রূপক। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, ওই প্রতিষ্ঠানটি নীতিভ্রষ্ট হয়েছিল। এটা তো একটা সাহিত্যিক সমালোচনা। এই সাহিত্যিক সমালোচনার প্রতিবাদ করাটা মূর্খতা। আর হেমা চাকমা সেই মূর্খতাই করেছেন। তাই তার প্রতি আমাদের কোনো সহানুভূতি নেই। আমাদের সহানুভূতি শুধু তাদের প্রতি, যারা আমাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে লাঠি হাতে মাঠে থাকে, হোক সেটা শিশুদের বিরুদ্ধে বা বৃদ্ধদের বিরুদ্ধে।
তিনি আরও যোগ করেন, আপনারা বলছেন সাইবার বুলিং। আমি বলছি এটা হলো ‘ডিজিটাল দাওয়াত’। আমাদের ভাই-ব্রাদাররা অনলাইনে হেমা চাকমাকে বোঝাচ্ছেন যে, বড়দের কথার ওপর কথা বলতে নেই। তারা হয়তো একটু কড়া ভাষায় বোঝাচ্ছেন, কিন্তু উদ্দেশ্য তো মহৎ। তারা চাচ্ছেন হেমা চাকমা মওদুদী ধর্ম গ্রহণ করুক, হেদায়েত লাভ করুক। এই মহৎ উদ্দেশ্যকে আপনারা বুলিং বলে ছোট করবেন না। আর আমার পাশে বসা সর্বমূত্র? ও তো মাসুম বাচ্চা। ও একটু রাগি, কিন্তু ওর দিলটা পরিষ্কার। ও শিশুদের কান ধরিয়েছে মানে ও শিশুদের ভালোবাসে, চায় না তারা নষ্ট হয়ে যাক। এই ভালোবাসা কি আপনারা চোখে দেখেন না? আপনাদের চোখে কি ছানি পড়েছে?
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে ভিপি সাদিক কায়েম এক অদ্ভুত ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এখন থেকে ডাকসুতে ‘চাকমা ফিল্টার’ বসানো হবে। এই ফিল্টারের কাজ হবে পরিমাপ করা কে কতটা মওদুদী ধর্মের অনুসারী। মিটারে যাদের রিডিং পজিটিভ আসবে, তারা যত অপরাধই করুক না কেন, তাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে ‘বিপ্লবী’ বা ‘সংস্কারক’। আর যাদের রিডিং নেগেটিভ আসবে, তাদের ভাগ্যে জুটবে অনলাইন ট্রায়াল এবং চরিত্র হনন। তিনি সর্বমূত্র চাকমা আরেকদফা চুমু দিয়ে বলেন, এই ছেলেটি আমাদের গর্ব। ও প্রমাণ করেছে যে, ভিপির অনুগত হলে আইন, আদালত, বা মানবাধিকার, কোনোকিছুই স্পর্শ করতে পারে না। এটাই হলো আমাদের পাওয়ার, এটাই আমাদের ম্যাজিক।
ওদিকে, সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, ভিপির এই ‘ভালো-খারাপ’ তত্ত্ব এবং গাণিতিক লজিক শোনার পর হেমা চাকমা নিজের ছোট চোখ আরো ছোট করে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তিনি হয়তো ভাবছেন, প্রতিবাদ করে কী ভুলটাই না করলাম! অন্যদিকে, ‘সর্বমূত্র’ চাকমা খুশিতে গদগদ হয়ে সাদিক কায়েমের মধ্যদণ্ডে বসে মওদুদী ধর্মের বিশেষ জিকির করে যাচ্ছেন এবং ভাবছেন, পরবর্তীতে কাদের কান ধরে ওঠবস করানো যায়, যাতে তার ‘গুড চাকমা’ রেটিং আরও বৃদ্ধি পায়।