নারীর জান্নাত হবে চার দেয়াল: আমীরে জামায়াতের ভিশন ও মোনামি ম্যাডামের মিশন

নারীর জান্নাত হবে চার দেয়াল: আমীরে জামায়াতের ভিশন ও মোনামি ম্যাডামের মিশন। A Paradise of Four Walls for Women: The Vision of Jamaat's Amir and Monami Madam's Mission. নারীর জান্নাত হবে চার দেয়াল: আমীরে জামায়াতের ভিশন ও মোনামি ম্যাডামের মিশন। A Paradise of Four Walls for Women: The Vision of Jamaat's Amir and Monami Madam's Mission.

আমীরে জামায়াত এর নারী বিদ্বেষী এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছেন ঢাবির মোনামি ম্যাডাম। নারী হয়েও তিনি কেন নারীদের চার দেয়ালে বন্দি করার পক্ষে সাফাই গাইছেন?

বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: বাংলার আকাশে উদিত হতে যাচ্ছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যার জন্য জাতি চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছিল বিগত কয়েক যুগ ধরে। নারী স্বাধীনতার নামে যে উশৃংখলতা সমাজকে গ্রাস করছিল, তার অবসান ঘটাতে ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি যে বোমাটি ফাটিয়েছেন, তা যেন বাংলার ধর্মপ্রাণ পুরুষ সমাজের মনের কথাই প্রতিধ্বনি। কর্মজীবী নারীদের তিনি যে বিশেষ ‘উপাাধি’তে ভূষিত করেছেন, তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় উঠলেও, এর গূঢ় রহস্য এবং তাৎপর্য বুঝতে হলে আমাদের যেতে হবে আরও গভীরে। আর এই গভীর তত্ত্বে ডুব দিতে আমাদের সাহায্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত শিক্ষিকা, ছাত্রদলের ত্রাস এবং শিবির শিক্ষার্থীদের হৃদয়ের স্পন্দন, সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন ভূঁইয়া, যাকে ভালোবেসে শিক্ষার্থীরা ‘মোনামি ম্যাডাম’ বা ক্যাম্পাসের ‘সুগার মাম্মি মোনামি’ বলেও ডাকে।

ঘটনার সূত্রপাত আমীরে জামায়াতের একটি ভেরিফাইড পোস্ট থেকে, যেখানে তিনি কর্মজীবী নারীদের নৈতিক স্খলন নিয়ে অত্যন্ত ‘উচ্চমার্গীয়’ এবং ‘গবেষণালব্ধ’ মন্তব্য পেশ করেছেন। তার মতে, ঘরের বাইরে কাজ করা নারীরা আসলে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং তিনি তাদের জন্য একটি বিশেষ বিশেষণ ব্যবহার করেছেন, যা উচ্চারণ করতে গেলে অনেক সুশীল সমাজের প্রতিনিধির দাঁত কপাট লেগে যেতে পারে। কিন্তু আমীর সাহেব তো আর সাধারণ কেউ নন, তিনি ভিশনারি। তার এই যুগান্তকারী চিন্তাধারার সাথে একাত্মতা পোষণ করে ময়দানে নেমেছেন মোনামি ম্যাডাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি ‘লিবারেল’ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হয়েও তিনি যেভাবে আমীরে জামায়াতের এই ‘নারী-বান্ধব’ (!) তত্ত্বের ঝান্ডা ধরেছেন, তা দেখে অনেকেই ভিমরি খাচ্ছেন।

মোনামি ম্যাডাম তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আপনারা কেন আমীর সাহেবের কথায় এত রিঅ্যাক্ট করছেন? উনি তো ভুল কিছু বলেননি! আমি নিজে কর্মজীবী নারী, কিন্তু আমি কি নিজেকে বাজারের পণ্য মনে করি? মোটেই না। আমি ঢাবির পুণ্যভূমিতে কাজ করি, আমার কাজের ধরণ আলাদা। আমি ছাত্রদের গাইড করি, তাদের সঠিক পথের দিশা দেই, বিশেষ করে যারা একটু ‘পথভ্রষ্ট’ হতে চায় বা শিবিরের মতো ‘ইনোসেন্ট’ সংগঠন করে, তাদের আমি স্নেহের ছায়ায় আগলে রাখি। আমীর সাহেব যে কর্মজীবী নারীদের কথা বলেছেন, তারা হলো সেই সব নারী যারা আমার মতো ‘পবিত্র’ দায়িত্ব পালন করছে না। আপনারা কেন রাগ করছেন? আপনারা কি আমার চেয়েও বড় কর্মজীবী নারী হয়ে গেলেন?”

মোনামি ম্যাডামের এই বক্তব্যে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তিনি নিজেকে সাধারণ কর্মজীবী নারীদের কাতারে ফেলতে নারাজ। তার মতে, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে নারীদের জন্য যে ‘স্বর্গরাজ্য’ বা ‘জান্নাত’ তৈরি করবে, তা হবে চার দেয়ালের ভেতরে। সেখানে নারীদের আর রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অফিসে যেতে হবে না। তারা থাকবে ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে, স্বামীর সেবায় মগ্ন। শিক্ষা? সে তো অনেক পরের কথা। আমীরে জামায়াতের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, নারীদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই। কারণ, রুটি বেলার জন্য পিএইচডি ডিগ্রির দরকার হয় না, আর স্বামীর পকেট গরম থাকলে স্ত্রীর আবার উপার্জনের কী দরকার? এই মহান দর্শনেরই প্রচারক হয়ে উঠেছেন মোনামি ম্যাডাম।

আমীরে জামায়াতের ভিশন ২০৩০-এ নারীর অবস্থান হবে অত্যন্ত সুসংহত এবং সুরক্ষিত। জানা গেছে, দলটির সরকার গঠনের পর নারীদের জন্য থাকবে বিশেষ ‘লকডাউন’ ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় নারীরা একা একা বাসার বাইরে বের হতে পারবে না। সাথে অবশ্যই একজন ‘মাহারাম’ বা পুরুষ অভিভাবক থাকতে হবে। সেটি স্বামী, বাবা, ভাই বা ছেলে হতে পারে। যদি কেউ না থাকে? তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে ‘ভলান্টিয়ার মাহারাম’ বা স্বেচ্ছাসেবক অভিভাবক সরবরাহ করা হবে, যারা নারীদের বাজারে বা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। এতে করে নারীদের নিরাপত্তা ১০০ ভাগ নিশ্চিত হবে। রাস্তায় কোনো ইভটিজিং থাকবে না, কারণ রাস্তায় কোনো নারীই থাকবে না! কী চমৎকার সমাধান!

শফিকুর রহমানের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মোনামি ম্যাডামদের মতো নারীরাই হবে মূল চালিকাশক্তি। কারণ, পুরুষরা বললে নারীরা হয়তো বিদ্রোহ করতে পারে, কিন্তু যখন একজন নারী, তাও আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হয়ে বলবেন যে, “নারীদের আসল জায়গা রান্নাঘর”, তখন সাধারণ নারীরা কনফিউজড হয়ে যাবে। তারা ভাববে, “ম্যাডাম যখন বলছেন, তখন নিশ্চয়ই এতে কোনো কল্যাণ আছে।” একেই বলে সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধে জামায়াতের সেনাপতি হলেন মোনামি ম্যাডাম। তিনি তার শিক্ষার্থীদের বোঝাচ্ছেন যে, আধুনিকতা মানেই ছোট কাপড় পরা বা অফিসে কাজ করা নয়; প্রকৃত আধুনিকতা হলো জামায়াতের মওদুদী ধর্মের নির্দেশ মেনে চার দেয়ালের মাঝে নিজেকে বন্দি করে রাখা। একে তিনি নাম দিয়েছেন ‘স্পিরিচুয়াল কোয়ারেন্টাইন’ বা আত্মিক সঙ্গনিরোধ।

মজার ব্যাপার হলো, মোনামি ম্যাডাম নিজেও কিন্তু চার দেয়ালে বন্দি নন। তিনি ক্যাম্পাসে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, প্রক্টরিয়াল বডিতে কাজ করছেন, ছাত্রদের ‘সুগার মাম্মি’ হয়ে তাদের আবদার মেটাচ্ছেন। কিন্তু যখনই অন্য নারীদের অধিকারের প্রশ্ন আসে, তখনই তিনি আমীর সাহেবের সুরে সুর মেলাচ্ছেন। একেই হয়তো বলে, “নারীর প্রধান শত্রু নারী”। তিনি নিজে যে সুবিধা ভোগ করছেন, তা অন্য নারীদের জন্য হারাম করতে চাইছেন। কারণ, সব নারী যদি বাইরে বেরিয়ে আসে, তবে তার ‘এক্সক্লুসিভিটি’ নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি চান, তিনি একাই রাজত্ব করবেন, আর বাকিরা থাকবে প্রজার মতো।

জামায়াতের ব্লু-প্রিন্ট অনুযায়ী, আগামীতে বাংলাদেশে মেয়েদের স্কুল-কলেজগুলো ধীরে ধীরে ‘হোম সায়েন্স’ বা গার্হস্থ্য অর্থনীতি শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। সেখানে শেখানো হবে কীভাবে নিখুঁত গোল রুটি বানাতে হয়, কীভাবে স্বামীর মেজাজ বুঝে কথা বলতে হয় এবং কীভাবে শাশুড়ির গঞ্জনা সহ্য করে মুখে হাসি ধরে রাখতে হয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বা গণিতের মতো কঠিন বিষয়গুলো মেয়েদের কোমল মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর বলে ঘোষণা করা হবে। আর এই সিলেবাস প্রণয়ন কমিটির প্রধান হিসেবে হয়তো আমরা দেখতে পাবো আমাদের প্রিয় মোনামি ম্যাডামকে। তিনি তখন টিভিতে টকশোতে এসে বলবেন, “মেয়েদের আসলে রকেট সায়েন্স পড়ার দরকার নেই, তাদের দরকার পারফেক্ট বিরিয়ানি রান্না করা শেখা। আমি নিজে পিএইচডি করেছি ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে আমার স্বামীর কাছে আমার রান্নার কদরই বেশি।”

এই যে এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা বৈপরীত্য, এটাই হলো জামায়াতের রাজনীতির মূল মন্ত্র। তারা নারীদের ব্যবহার করেই নারী অধিকার হরণ করবে। শফিকুর রহমান সাহেব জানেন, সরাসরি পুরুষ দিয়ে নারীদের দমন করা কঠিন, তাই তিনি বেছে নিয়েছেন মোনামি ম্যাডামদের। এরা হবে সেই ট্রোজান হর্স, যারা নারী স্বাধীনতার দুর্গে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা খুলে দেবে মৌলবাদের জন্য। তখন আর নারীদের পালানোর কোনো পথ থাকবে না। তাদের একমাত্র ভবিষ্যৎ হবে চার দেয়ালের অন্ধকার এবং মওদুদী ধর্মের ফতোয়ার বই।

ইতিমধ্যে আমীর সাহেবের এই বক্তব্যের পর সারাদেশে তার অনুসারীরা, বিশেষ করে শিবিরের ভাইরা বেশ উজ্জীবিত। তারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, “নারীরা আসলে কুইন, আর কুইন থাকে প্রাসাদের অন্দরমহলে, রাস্তায় নয়।” কী রোমান্টিক চিন্তাধারা! তারা তাদের ভবিষ্যৎ স্ত্রীদের জন্য এখনই লোহার শিকল… থুক্কু, সোনার গয়না গড়াচ্ছেন, যাতে তাদের ঘরে আটকে রাখা যায়। আর যারা এর বিরোধিতা করছে, তাদের জন্য মোনামি ম্যাডাম রেখেছেন তার শাণিত যুক্তি। তিনি বলছেন, “তোমরা যারা বাইরে কাজ করছো, তোমরা কি জানো তোমরা কত বড় পাপ করছো? তোমরা পুরুষের হক নষ্ট করছো। একটা মেয়ে চাকরি পাওয়া মানে একটা বেকার ছেলের হক নষ্ট হওয়া। তোমরা ঘরে ফিরে যাও, সংসার ধর্ম পালন করো, দেখবে দেশে আর কোনো বেকার সমস্যা থাকবে না।”

এই অকাট্য যুক্তির পর আর কোনো কথা চলে না। সত্যিই তো, নারীরা যদি চাকরি না করে, তবে সব চাকরি পুরুষরা পাবে, আর পুরুষরা চাকরি পেলে তারা বিয়ে করবে, আর বিয়ে করলে নারীরা স্বামী পাবে। অর্থাৎ, দিনশেষে লাভ নারীদেরই! এই সিম্পল ইকুয়েশনটা যারা বোঝে না, তাদের জন্যই শফিকুর রহমান সাহেব ওই ‘বেশ্যা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আর মোনামি ম্যাডাম সেই শব্দটিকে বৈধতা দিচ্ছেন তার একাডেমিক গ্ল্যামার দিয়ে।

আগামীর বাংলাদেশ হবে এক অদ্ভুত জাদুর দেশ। যেখানে সকালবেলা নারীদের টিফিনবক্স হাতে স্কুলে যেতে দেখা যাবে না, অফিস আদালতে শাড়ি বা সালোয়ার কামিজের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। সব হবে পুরুষময়। আর এই পুরুষতান্ত্রিক জান্নাতের গেটকিপার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন মোনামি ম্যাডাম, হাতে চাবুক… না না, হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে, আমীরে জামায়াতকে স্বাগত জানানোর জন্য। আর সাধারণ নারীরা? তারা জানালার ফাঁক দিয়ে সেই দৃশ্য দেখবে আর ভাববে, “ইস, আমি যদি মোনামি ম্যাডাম হতাম! তাহলে অন্তত বাইরে বের হতে পারতাম।” কিন্তু হায়, সবার কপালে তো আর ‘সুগার মাম্মি’ হওয়ার সৌভাগ্য জোটে না, কারও কারও কপালে জোটে শুধুই চার দেয়ালের বন্দিত্ব।

আসুন, আমরা সবাই মিলে আমীরে জামায়াত এবং মোনামি ম্যাডামের এই মহৎ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কারণ, নারীদের স্বাধীনতা অনেক হয়েছে, এবার একটু পরাধীনতার স্বাদ নেওয়া দরকার। এতে নাকি আত্মার শান্তি মেলে, ইহকাল ও পরকালে অশেষ নেকি হাসিল হয়। অন্তত মোনামি ম্যাডাম এবং শফিকুর রহমান সাহেব তো তাই-ই বলছেন!

#, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *