জুলাই যোদ্ধার মায়ের কান্না নাকি পরিকল্পিত নাটক? জামায়াত আমির শফিকুর রহমান এর তথাকথিত হালাল ফ্রি মিক্সিং এর আদ্যোপান্ত।
বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটাই আলোচনা, একটাই গুঞ্জন, আর তা হলো ‘হারাম’ কীভাবে চোখের পলকে ‘হালাল’ হয়ে যায়। সম্প্রতি এক অভাবনীয় দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে দেশবাসী, যা দেখে বহুদিন ধরে জমে থাকা চোখের ছানিও যেন জাদুকরীভাবে পরিষ্কার হয়ে গেছে। দৃশ্যটি আর কিছু নয়, কট্টর মৌলবাদী এবং নারী স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাক্তার শফিকুর রহমানকে দেখা গেছে এক নারীকে প্রকাশ্যে জড়িয়ে ধরে ফটোসেশন করতে। যে দলটির নেতারা কর্মজীবী নারীকে ‘বেশ্যা’ বলে ফতোয়া দেয়, নারীদের চাকরি বা পড়ালেখাকে ‘ফিতনা’ বলে আখ্যায়িত করে, সেই দলেরই সর্বোচ্চ নেতার এমন প্রকাশ্য ‘আলিঙ্গন-বিলাস’ দেখে সাধারণ জনগনের মনে প্রশ্ন জেগেছে, তবে কি মওদুদী ধর্মের ল্যাবরেটরিতে নতুন কোনো ফর্মুলা আবিষ্কৃত হয়েছে?
ঘটনার সূত্রপাত একটি রাজনৈতিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে। সেখানে হঠাৎ দেখা যায়, এক নারী আবেগে আপ্লুত হয়ে জামায়াতের আমিরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। প্রাথমিকভাবে উপস্থিত জনতা এবং নেটিজেনরা ভেবেছিলেন, এটি হয়তো এক স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বহিঃপ্রকাশ। এক ‘মমতাময়ী!’ নারী তার ‘সন্তানতুল্য!’ নেতার বুকে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু হায়! প্রযুক্তির এই যুগে কিছুই আর গোপন থাকে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফাঁস হয়ে গেল ‘বিহাইন্ড দ্য সিন’ ভিডিও। সেই ভিডিওতে দেখা গেল এক এলাহি কাণ্ড। সিনেমা শুটিংয়ের আদলে সেখানে চলছে মহড়া। তথাকথিত ‘জুলাই যোদ্ধাদের মা’ পরিচয়দানকারী নারীদের আগে থেকেই ভাড়া করে আনা হয়েছে। তাদের লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে ঠিক যেন স্কুলের অ্যাসেম্বলি। আর আমাদের মহান আমিরে জামায়াত সেখানে পরিচালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে লাইন সোজা করছেন, পজিশন ঠিক করে দিচ্ছেন এবং নির্দেশ দিচ্ছেন কীভাবে কান্নার অভিনয় করতে হবে। অ্যাকশন বলার সাথে সাথেই শুরু হলো সেই ঐতিহাসিক আলিঙ্গন ও কান্নাকাটি। যা দেখে ঢালিউডের অভিনেত্রীরাও লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছেন।
এই ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা ও হাস্যরস। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যে জামায়াতে ইসলামী নারীদের ‘তেঁতুল’ এর সাথে তুলনা করতেও দ্বিধা করে না, যারা নারীদের ঘরের চার দেয়ালে বন্দি রাখাকেই ‘ঈমানি দায়িত্ব’ মনে করে, সেই দলের আমির কীভাবে পরনারীর স্পর্শকে জায়েজ করলেন? তবে কি তাদের মওদুদী ধর্মের কিতাবে ‘আমিরের জন্য বিশেষ ছাড়’ নামক কোনো অধ্যায় আছে? নাকি মওদুদী ধর্মের মেশিনে প্রসেস হয়ে আসার কারণে এই আলিঙ্গন এখন ‘পিওর হালাল’ হয়ে গেছে?
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের এই আলিঙ্গন প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত শিক্ষিকা, ছাত্রদলের ত্রাস এবং শিবির শিক্ষার্থীদের হৃদয়ের স্পন্দন, সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন ভূঁইয়া, যাকে ভালোবেসে শিক্ষার্থীরা ‘মোনামি ম্যাডাম’ বা ক্যাম্পাসের ‘সুগার মাম্মি মোনামি’ বলেও ডাকে, সেই মোনামি ম্যাডাম কার্টুনুস ডেইলির প্রতিবেদককে জানিয়েছে, এই আলিঙ্গন সাধারণ কোনো আলিঙ্গন নয়। এটি হলো ‘সাংগঠনিক আলিঙ্গন’। সাধারণ কোনো নারী-পুরুষ যদি পার্কে বা রাস্তায় হাত ধরে হাটে, তবে তা হলো নির্লজ্জ বেহায়াপনা, অশ্লীলতা এবং ফ্রি-মিক্সিং, যার শাস্তি পাথর নিক্ষেপ বা দোররা মারা। কিন্তু যখন জামায়াতের আমির কোনো নারীকে জড়িয়ে ধরেন, তখন তা আর ফ্রি-মিক্সিং থাকে না, তা হয়ে যায় ‘জিহাদি মোলাকাত’। মোনামি ম্যাডাম আরও জানায়, জামায়াতের গঠনতন্ত্র ও মওদুদী ধর্মের ফতোয়া অনুযায়ী, দলের শীর্ষ নেতারা হলেন এক একটি ‘অটোমেটিক পিউরিফায়ার’। তাদের স্পর্শ লাগলে হারাম বস্তুও হালাল হয়ে যায়। তাই কোনো নারী অন্য কোন পরপুরুষের সংস্পর্শে আসলে তা জাহান্নামের রাস্তা প্রশস্ত করলেও, জামায়াতের আমিরের বুকে মাথা রাখলে তা জান্নাতের টিকেট কনফার্ম করে দেয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এক ভুক্তভোগী নারী শিক্ষার্থী ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, “ছাত্রশিবিরের ভাইরা আমাকে বলেছিল, মেয়েদের একা বাইরে বের হওয়া মানেই তারা পতিতার মতো আচরণ করছে। হিজাব না পরলে বা ছেলেদের সাথে কথা বললে আমাদের গায়ে ‘খারাপ মেয়ে’র ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হতো। আজ সেই ভাইদের নেতা যখন প্রকাশ্যে নারীদের সাথে গলাগলি করছেন, তখন কি তাদের ফতোয়া মেশিন নষ্ট হয়ে গেছে?”
আসলে জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, তাদের এই ভণ্ডামি নতুন কিছু নয়। ১৯৭১ সালে তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নারকীয় নারী নির্যাতনকে ‘গনিমতের মাল’ বলে বৈধতা দিয়েছিল। ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা বরাবরই নারীদের দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। অথচ রাজনৈতিক ফয়দা লোটার জন্য আজ তারা ‘জুলাই যোদ্ধাদের মা’ নাটক সাজিয়ে নারীদের ব্যবহার করছে। যেই নারীদের তারা এতদিন ঘরের কোণে আটকে রাখতে চেয়েছে, আজ ক্ষমতার লোভে তাদেরই রাস্তায় নামিয়ে ‘শো-পিস’ হিসেবে ব্যবহার করছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, মহড়ার সময় আমির সাহেব বেশ কড়া মেজাজেই নারীদের পজিশন ঠিক করে দিচ্ছেন। যেন তিনি কোনো রাজনৈতিক নেতা নন, বরং এফডিসির কোনো ড্যান্স ডিরেক্টর।
দলের তরুণ কর্মীরা অবশ্য এই ঘটনায় বেশ উজ্জীবিত। তারা মনে করছেন, আমিরের এই ‘আধুনিক’ পদক্ষেপের ফলে দলের ‘ব্যাকডেটেড’ ভাবমূর্তি ঘুচে যাবে। এক শিবির কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “হুজুরের এই হাগ (আলিঙ্গন) আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা এতদিন মেয়েদের সাথে কথা বলতে ভয় পেতাম, পাছে গুনাহ হয়। কিন্তু এখন বুঝলাম, নিয়ত যদি ‘রাজনৈতিক’ হয়, তবে সবই জায়েজ। আমরাও এখন থেকে সাংগঠনিক কাজে বান্ধবীদের সাথে ফ্রি-মিক্সিং করব, কারণ আমাদের আমির পথ দেখিয়েছেন।” এই নতুন ‘ফতোয়া’ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। তারা এখন একে অপরকে বলছে, “দোস্ত, টেনশন করিস না, মওদুদী ফিল্টার অন কর, সব হালাল হয়ে যাবে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা জামায়াতের দেউলিয়াত্বের প্রমাণ। তারা এখন ‘ইমোশনাল গেম’ খেলতে শুরু করেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, তাদের এই খেলা খেলতে গিয়ে কাঁচা হাতের কাজ ধরা পড়ে গেছে। ভিডিও ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাদের ‘কান্নার অভিনয়’ এখন ‘হাসির খোরাক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেই মায়েরা নাকি সন্তান হারিয়ে শোকে পাথর, তারা কীভাবে পরিচালকের নির্দেশে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে পজিশন নিয়ে কাঁদে?
মজার ব্যাপার হলো, অন্য কোনো দলের নেতা যদি এমন কাজ করতেন, তবে এতক্ষণে জামায়াতের বটবাহিনী ফেসবুকে তুফান তুলে ফেলত। তারা ওই নেতার ফাঁসি চাইত, তাকে নাস্তিক, মুরতাদ এবং লম্পট বলে গালিগালাজ করত। কিন্তু নিজেদের আমিরের বেলায় তারা একেবারে ‘স্পিকটি নট’। বরং কেউ কেউ একে ‘পিতার স্নেহ’ বা ‘আধ্যাত্মিক স্পর্শ’ বলে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, অন্যের বেলায় যা ‘লীলাখেলা’, নিজেদের বেলায় তা ‘আধ্যাত্মিকতা’। এই দ্বিচারিতা জামায়াতের রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার।
এই ঘটনার পর জামায়াতের ভেতরের রক্ষণশীল অংশও বেশ বিব্রত। তারা মনে করছেন, আমিরের এই ‘উদারতা’ দলের মূল আদর্শের পরিপন্থী। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ রুকন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা সারাজীবন শিখলাম নারী মানেই পর্দা, নারী মানেই অন্তরাল, নারী মানেই চার দেয়ালের বন্দিনী। আর এখন শেষ বয়সে এসে দেখতে হচ্ছে আমির সাহেব খোলা মাঠে নারীদের সাথে কোলাকুলি করছেন! এটা তো কেয়ামতের আলামত।” তবে দলের মডারেট অংশ একে ‘স্ট্র্যাটেজিক মুভ’ হিসেবেই দেখছে। তাদের মতে, ক্ষমতায় যেতে হলে একটু-আধটু অভিনয় করতেই হয়। আর পাবলিক তো গাধা, তারা এসব ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে যাবে না।
এদিকে, এই ঘটনার পর থেকে ‘হালাল ফ্রি মিক্সিং’ শব্দটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ঢাকার বিভিন্ন চায়ের দোকানে, তরুন তরুনীদের আড্ডায় এখন একটাই জোক “দোস্ত, মন খারাপ? আসো একটা হালাল হাগ দেই, সব ঠিক হয়ে যাবে।” এমনকি প্রেমিক-প্রেমিকারাও এখন পার্কের চিপায় চাপায় ডেটিংয়ে গিয়ে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বলছে, “আমরা তো প্রেম করছি না, আমরা জামায়াত কর্মী, সাংগঠনিক আলোচনা করছি।” ফলে পুলিশও কনফিউজড হয়ে যাচ্ছে, কাকে ধরবে আর কাকে ছাড়বে।
পরিশেষে বলা যায়, জামায়াতে ইসলামীর এই ‘নাটক’ তাদের রাজনৈতিক দৈন্যদশাকেই প্রকট করে তুলেছে। ধর্মের পবিত্র লেবাস পরে তারা যে নোংরা রাজনীতির চর্চা করছে, তা আজ সবার সামনে পরিষ্কার। নারীদের তারা সম্মান করে না, বরং পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে। কখনো ‘গনিমতের মাল’ হিসেবে, কখনো ‘তেঁতুল’ হিসেবে, আবার কখনো ‘ভাড়া করা মা’ হিসেবে। তাদের এই বহুরূপী চরিত্রের মুখোশ আজ উন্মোচিত। তবে একটা ধন্যবাদ তাদের দেওয়াই যায়, এই সিরিয়াস রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও তারা জনগণকে এমন বিনোদন উপহার দিয়েছে, যার জন্য কোনো কমেডি শো দেখার প্রয়োজন নেই। আমিরে জামায়াতের এই ‘অস্কারজয়ী’ পারফরম্যান্স জাতি বহুদিন মনে রাখবে। আর মনে রাখবে সেই জাদুকরী মওদুদী মেশিন, যা নিমিষেই হারামকে হালাল আর বেশ্যা (তাদের ভাষায়)কে ‘মায়ের জাতি’তে রূপান্তর করতে পারে।