আসিফ নজরুল কি অবশেষে এস জয়শঙ্কর এর সামনে বসে ২৬ লাখ ভারতীয়র খোঁজ পেলেন? পড়ুন আইন উপদেষ্টার কাচুমাচু ভঙ্গি এবং পুরনো ভারত বিদ্বেষী বুলি বনাম আজকের বাস্তবতার এক সরস বিশ্লেষণ।
বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: অবশেষে দেড় বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটাইয়া জাতীয় সংসদ ভবনের এক নিভৃত কক্ষে দেখা মিলিল দুই মেরুর দুই নক্ষত্রের। একদিকে বসিয়া ছিলেন ভারতের প্রতাপশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, আর ঠিক তাহার পাশেই কিছুটা ‘কাচুমাচু’ ভঙ্গিতে, অনেকটা প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টারের সামনে পড়া না পারা ছাত্রের ন্যায় বসিয়া ছিলেন আমাদের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। ছবিখানা প্রকাশিত হইবার পর হইতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘বিশেষ শিক্ষিত’ সমাজ এবং চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসা আমজনতার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাইতেছে, ইহা কি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, নাকি বস ও কর্মচারীর বাৎসরিক পারফরম্যান্স রিভিউ মিটিং?
ইতিহাসের পাতা উল্টাইলে দেখা যায়, পাঁচ আগস্টের সেই মেটিকুলাস ডিজাইনড ষড়যন্ত্রের পরে এই আসিফ নজরুল সাহেবের গলা দিয়া আগ্নেয়গিরির লাভার ন্যায় ভারতবিদ্বেষী বুলি নির্গত হইত। তিনি তখন জোর গলায়, অনেকটা কসম কাটার ভঙ্গিতে জাতিকে জানাইয়াছিলেন যে, এই বাংলাদেশে নাকি ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক অবৈধভাবে চাকরি করিতেছে। দেশের যুবসমাজ বেকার, অথচ ২৬ লাখ ভারতীয় আমাদের অর্থনীতির দফারফা করিয়া দিছে, এমন গরম তথ্যে তখন সাধারণ মানুষের রক্ত টগবগ করিয়া ফুটিত। কিন্তু হায়! ক্ষমতার মসনদে আসীন হইয়া দেড়টি বছর পার করিয়া ফেলিলেও, আইন উপদেষ্টা মহোদয় সেই ২৬ লাখের তালিকা হইতে একজন ‘অবৈধ ভারতীয়’র নামও প্রকাশ করিতে পারেন নাই। তিনি কি তবে হাওয়ায় ভাসিয়া আসা তথ্য দিয়া জাতিকে বিভ্রান্ত করিয়াছিলেন? নাকি এখন নিজেই সেই ২৬ লাখের একজন প্রতিনিধি হিসেবে ভারতীয় মন্ত্রীর সামনে হাত কচলাইতেছেন?
বুধবারের এই সাক্ষাতের দৃশ্যটি ছিল বড়ই মনোরম এবং শিক্ষণীয়। ছবিতে দেখা যায়, এস জয়শঙ্কর বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে, আত্মবিশ্বাসের সহিত বসিয়া আছেন, যেন তিনি নিজের ড্রয়িংরুমে বসিয়া সকালের চা পান করিতেছেন। অন্যদিকে আমাদের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বসিবার ভঙ্গি দেখিয়া মনে হইতেছিল, তিনি চেয়ারের এক কোণায় বড়ই অস্বস্তিতে রহিয়াছেন। তাহার হাতের তালু একটির সাথে অপরটি ঘষিয়া যে তাপ উৎপন্ন হইতেছিল, তাহা দিয়া হয়তো এক কেটলি চা অনায়াসেই তৈরি করা সম্ভব। শরীরি ভাষার বিজ্ঞানে ইহাকে ‘চরম বশ্যতা’ বা ‘বস-ভীতি’ বলা হইয়া থাকে। দেড় বছর ধরিয়া যেই ব্যক্তি ভারতের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়িলেন, সামনাসামনি দেখামাত্রই তাহার এই বিড়ালছানাসদৃশ আচরণ দেখিয়া জাতির মনে সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক, তবে কি আসিফ নজরুল নিজেই সেই ২৬ লাখ ভারতীয় কর্মচারীর একজন, যিনি এতকাল ছদ্মবেশে ছিলেন এবং আজ আসল বসের সামনে ধরা পড়িয়া গিয়াছেন?
এই দেড় বছরে দেশবাসী অনেক কিছুই দেখিয়াছে। কিন্তু যেই ২৬ লাখ ভারতীয়র দোহাই দিয়া মানুষের মনে ভারতবিদ্বেষের বীজ রোপণ করা হইছিল, তাহাদের টিকিটিও খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। যদি তর্কের খাতিরে ধরিয়াও নেওয়া হয় যে আসিফ নজরুলের কথা সত্য, তবে প্রশ্ন জাগে, এই সরকার দেড় বছরে কয়জন ভারতীয়কে ছাঁটাই করিয়াছে? কয়জনকে বর্ডার পার করাইয়া দিয়াছে? পরিসংখ্যানের খাতা তো শূন্য। শূন্য এই কারণে যে, ২৬ লাখ ভারতীয়র গল্পটি হয়তো ছিল এক বিশাল রাজনৈতিক ভাঁওতাবাজি। আর যদি সত্যিই তাহারা থাকিয়া থাকে এবং সরকার তাহাদের খুঁজিয়া না পায়, তবে তো বিষয়টি আরও ভয়াবহ। ইমিগ্রেশন পার হইয়া তাহারা যদি নিজ দেশে ফেরত না যায়, তবে তাহাদের কি গুম করিয়া ফেলা হইলো?
আন্তর্জাতিক আইনে এই পরিস্থিতি কিন্তু বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদ সংকেত। ভারত সরকার যদি এখন অফিশিয়ালি দাবি করে বসে যে, আমাদের ২৬ লাখ নাগরিক আপনাদের দেশে কর্মরত ছিল, কিন্তু এখন তাহাদের কোনো হদিস পাওয়া যাইতেছে না, সুতরাং বাংলাদেশ সরকার তাহাদের ‘গুম’ করিয়াছে, তখন আইন উপদেষ্টা মহোদয় কী জবাব দিবেন? আন্তর্জাতিক আদালতে গুমের মামলা ঠুকিয়া দিলে আসিফ নজরুল কি তখনো এস জয়শঙ্করের সামনে বসিয়া এমন কাচুমাচু হাসি দিবেন? নাকি তখন বলিবেন, “স্যার, আমি তো আসলে জোকস করিয়াছিলাম, পাবলিক সেন্টিমেন্ট কাজে লাগাইতে একটু গুজব ছড়াইয়াছিলাম মাত্র!”
আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় এখানে উঁকি দিতেছে। আসিফ নজরুল কি তবে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদেরই ‘ভারতীয়’ মনে করিতেন? দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বিদেশি ট্যাগ দিয়া তিনি কি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের নীল নকশা বাস্তবায়ন করিতে চাহিয়াছিলেন? যদি তাহা না হয়, তবে সেই ২৬ লাখ লোক কোথায়? তাহারা কি মাটির নিচে বাঙ্কারে লুকাইয়া আছে, নাকি উপদেষ্টার নিজের মন্ত্রণালয়েই ফাইল চাপা দিয়া বসিয়া আছে? দেড় বছরেও যখন এই তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হইল না, তখন ধরিয়া নেওয়া যাইতে পারে যে, ২৬ লাখের সংখ্যাটি ছিল একটি রূপকথা, যাহা ড. ইউনুসের এনজিও-মার্ক সরকারের ক্ষমতায় আসার সিড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হইয়াছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানও। তিনিও হয়তো ভাবিতেছিলেন, পাশের জন এত ঘামিতেছেন কেন! ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিশেষ ফ্লাইটে এস জয়শঙ্কর যখন ঢাকায় নামিলেন, তখন হয়তো তিনি ভাবেন নাই যে, তাহাকে অভ্যর্থনা জানাইতে আসা বা বৈঠকে বসা ব্যক্তিদের মধ্যে এমন ‘ভক্তকূল’ খুঁজিয়া পাইবেন। আসিফ নজরুলের এই ‘কাচুমাচু’ ছবিটি এখন জাতীয় মিমে পরিণত হইয়াছে। লোকে বলাবলি করিতেছে, ২৬ লাখ ভারতীয়র মধ্যে প্রথম ও প্রধান ব্যক্তিকে অবশেষে শনাক্ত করা গিয়াছে এবং তিনি এখন আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রহিয়াছেন। নতুবা বসের সামনে এমন ভব্য ও সভ্য হইয়া, হাত কচলানো ভঙ্গিতে বসিবার আর কী ব্যাখ্যা থাকিতে পারে?
পরিশেষে বলা যাইতে পারে, রাজনীতিতে কথার ফুলঝুরি অনেক ফোটানো যায়, কিন্তু দিনশেষে সত্যের মুখোমুখি হইতেই হয়। আসিফ নজরুল হয়তো ভাবিয়াছিলেন, ক্ষমতার দাপটে ২৬ লাখের গল্পটি মানুষ ভুলিয়া যাইবে। কিন্তু জনগণ ভুলিয়া যায় নাই। আজ যখন তিনি ভারতীয় মন্ত্রীর পাশে বসিয়া বশ্যতা স্বীকারের চূড়ান্ত নমুনা প্রদর্শন করিলেন, তখন প্রমাণিত হইল, মুখে ভারত বিদ্বেষ আর অন্তরে ও আচরণে ভারত ভক্তি, ইহাই হইল এই এনজিও-শাসিত অন্তর্বর্তী সরকারের আসল রূপ। এখন দেখার বিষয়, আগামীতে এই ‘কাচুমাচু’ উপদেষ্টা মহোদয় সেই কাল্পনিক ২৬ লাখ ভারতীয়র তালিকা প্রকাশ করেন, নাকি নিজেই সেই তালিকার এক নম্বর সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আপাতত জয়শঙ্করের সামনে তাহার এই ‘অসহায় আত্মসমর্পণ’ ও ‘বিনয়ী ভঙ্গি’ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে (কিংবা মিমের পাতায়) লেখা থাকিবে। হায় সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ, আর কী বিচিত্র এখানকার ২৬ লাখি গালগপ্পোবাজ উপদেষ্টারা!