দিল্লি না ঢাকা? ভারত বয়কটের ডাক আর তলে তলে তেল আমদানির দ্বিমুখী নীতি

দিল্লি না ঢাকা? ভারত বয়কটের ডাক আর তলে তলে তেল আমদানির দ্বিমুখী নীতি। Delhi or Dhaka? The Double Standard of Boycotting India While Secretly Importing Oil. দিল্লি না ঢাকা? ভারত বয়কটের ডাক আর তলে তলে তেল আমদানির দ্বিমুখী নীতি। Delhi or Dhaka? The Double Standard of Boycotting India While Secretly Importing Oil.

রাস্তায় হাসনাত আব্দুল্লাহ স্লোগান দিচ্ছেন ‘দিল্লি না ঢাকা’, অথচ অন্তর্বর্তী সরকার গোপনে ভারত থেকেই কিনছে হাজার কোটি টাকার তেল!

বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: জুমা বৌদির গোপন সূত্র ও অন্তর্বর্তী দপ্তরের বিশ্বস্ত টিকটিকি মারফত জানা গিয়াছে যে, গত কয়েক রজনী ধরিয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সেনাপতি এবং খাট কাপানো বক্তা হাসনাত আব্দুল্লাহর চোখের পাতা এক হইতেছে না। গভীর নিশীথে যখন সমগ্র ঢাকা শহর মশার গানের সুরে ঘুমাচ্ছন্ন, তখনও হাসনাত সাহেব হঠাৎ ধড়ফড় করিয়া জাগিয়া উঠিতেছেন। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, চোখেমুখে এক অজানা আতঙ্ক, যেন কোনো অদৃশ্য পাইপলাইন তাঁহার গলার কাছে আসিয়া পেঁচাইয়া ধরিতেছে। ঘুমের মধ্যে তিনি অবিরত বিড়বিড় করিতেছিলেন, ‘দিল্লি না ঢাকা? দিল্লি না ঢাকা?’ এবং হঠাৎ সশব্দে স্লোগান ধরিয়া বলেন, ‘দিল্লি না ঢাকা, ইউনূসের হেডা!’ এই স্লোগান শুনিয়া জুমা বৌদি মনে করিয়াছিল বুঝি নতুন কোনো মার্চ টু যমুনা শুরু হইয়াছে। কিন্তু ঘটনা আসলে ভিন্ন। ঘটনাটি মূলত দেড় হাজার কোটি টাকার তরল এবং দাহ্য।

ঘটনার গভীরে গিয়া দেখা গেল, এই নিদ্রাহীনতার মূল কারণ নিহিত রহিয়াছে অন্তর্বর্তী সরকারের এক গোপন অথচ ওপেন সিক্রেট সিদ্ধান্তের ফাইলে। যে ভারত খেদাও আন্দোলনে গত কয়েক মাস ধরিয়া রাজপথ উত্তপ্ত, যে দিল্লির দাদাগিরি খতম করিবার জন্য গলার রগ ফুলানো হইলো, সেই ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি হইতেই এক লাখ আশি হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির পাকা কথা দিয়া বসিয়াছে বর্তমান সরকার। যেই সরকার গঠিত হইয়াছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকিবার ওয়াদা দিয়া, সেই সরকারের কলমের এক খোঁচায় এক হাজার চারশ বাষট্টি কোটি টাকা চলিয়া যাইতেছে সেই ‘দাদাদের’ পকেটেই। এই সংবাদ কানে আসিবার পর হইতেই হাসনাত সাহেবের বিপ্লবের ইঞ্জিনে যেন ভেজাল তেল ঢুকিয়া গিয়াছে। তিনি ভাবিতেছেন, সারাদিন মাইকের সামনে দাঁড়াইয়া ‘দিল্লি হটাও’ বলিয়া গলা ফাটাইলাম, আর দিনশেষে সেই দিল্লির তেল দিয়াই বিপ্লবের জেনারেটর চালাইতে হইতেছে? এ কেমন বিচার?

জুমা বৌদির সূত্র আরও জানাইতেছে, এই তেল আমদানির খবরটি যখন সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের টেবিলে পাস হইতেছিল, তখন উপদেষ্টারা একে অপরের দিকে চাউনি বিনিময় করিয়া মুচকি হাসিতেছিলেন। তাঁহারা হয়তো মনে মনে ভাবিতেছিলেন, আবেগের বশে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়া সহজ, কিন্তু এসি রুমে বসিয়া বাতি জ্বালাইতে হইলে বা রাস্তায় গাড়ি চালাইতে হইলে সেই ‘শত্রু’র তেল ছাড়া গতি নাই। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ যখন ফাইলে সই করিতেছিলেন, তখন হয়তো বাতাসে ফিসফিস করিয়া ভাসিয়া আসিতেছিল সেই চিরন্তন সত্য, পেটে ক্ষুধা আর গাড়িতে তেল না থাকিলে বিপ্লব দিয়া চিড়া ভিজে না। জানা গিয়াছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি এই তেলের দামের একাংশ দিবে, আর বাকিটা ব্যাংক ঋণ করিয়া পরিশোধ করা হইবে। অর্থাৎ, ঋণ করিয়া হইলেও ঘি খাওয়ার মতো অবস্থা, তবে এখানে ঘি-এর বদলে ইন্ডিয়ান ডিজেল খাওয়া হইতেছে।

অথচ ৫ আগস্টের আগে চিত্রটা কতই না স্বচ্ছ ছিল। বিগত সরকার, যাহাদের আমরা এখন স্বৈরাচার বলিয়া গালি দিতেছি, তাহারা অন্তত লুকোছাপা করিত না। শেখ হাসিনার সরকার জানিত যে প্রতিবেশী বদলানো যায় না, তাই প্রতিবেশীর সাথে সদ্ভাব রাখিয়া দেশের চাকা সচল রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। তখন সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বের, ন্যায্যতার এবং আস্থার। জাহাজ দিয়া কয়লা আসিত, রেললাইন দিয়া পণ্য আসিত, আর সীমান্তে মিষ্টি বিনিময় হইতো। কিন্তু হায়! আগস্টের সেই অভিশপ্ত দুপুরের পর একদল উচ্চাভিলাসী সমন্বয়ক ও তাহাদের মুরুব্বিরা আসিয়া বুঝাইল, ভারতের সাথে সম্পর্ক রাখা মানেই দাসত্ব। তাহারা এমন একখানা ভাব ধরিল যেন কাল হইতেই আমরা সৌদি আরবের তেল মাগনা পাইব অথবা আকাশের বিজলি ধরিয়া জেনারেটর চালাইব। সাধারণ মানুষকে বোঝানো হইলো, ভারতীয় পণ্য বর্জন কর। পেঁয়াজ খাইও না, শাড়ি পরো না, এমনকী ভারতীয় সিরিয়াল দেখাও পাপ। কিন্তু এখন দেখা যাইতেছে, সেই বর্জনের বুলি আসলে জনগণকে বোকা বানানোর এক অপকৌশল মাত্র। পাবলিক যখন ভারতীয় টুথপেস্ট ফেলিয়া দিতেছে, তখন সরকার ভারতীয় তেলের ট্যাংকার খালাস করিতেছে।

হাসনাত আব্দুল্লাহর দুঃস্বপ্নের কারণ শুধু এই তেল আমদানি নয়, বরং নিজের ও নিজের দলের ভণ্ডামি উন্মোচন হইবার ভয়। তিনি ভাবিতেছেন, কাল সকালে যখন তিনি আবারও শাহবাগে দাঁড়াইয়া ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ নিপাত যাক’ বলিয়া স্লোগান দিবেন, তখন যদি পিছন হইতে কোনো রিকশাওয়ালা ভাই প্রশ্ন করিয়া বসে, ‘ভাইজান, যে মাইকে চিল্লাইতেছেন, সেই মাইকের জেনারেটরের তেলটা কোন দেশের?’ তখন তিনি কী জবাব দিবেন? এই লজ্জার ভয়েই তিনি নির্ঘুম রাত কাটাইতেছেন। তাহার মনে পড়িতেছে সেই সোনালী অতীতের কথা, যখন শেখ হাসিনা শক্ত হাতে দেশের হাল ধরিয়াছিলেন। তখন কূটনীতি ছিল পরিপক্ব, আবেগবর্জিত এবং বাস্তবমুখী। ভারতবিরোধী সস্তা সেন্টিমেন্ট বিক্রি করিয়া তখন রাজনীতি করিবার প্রয়োজন পড়িত না। বরং দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতায় মৈত্রী পাইপলাইন তৈরি হইয়াছিল, যাহা দিয়া আজ এই সরকার তেল আনিতে বাধ্য হইতেছে। বর্তমান শাসকরা মুখে বড় বড় কথা বলিলেও, কাজের বেলায় সেই শেখ হাসিনার করা পাইপলাইন আর চুক্তির শরণাপন্নই হইতে হইতেছে। ইহাকেই কি বলে ইতিহাসের প্রতিশোধ?

বিশ্লেষকদের মতে, এই ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকার লেনদেন প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র পরিচালনা আর টিএসসি-তে দাঁড়াইয়া জ্বালাময়ী ভাষণ দেওয়া এক জিনিস নয়। ‘দিল্লি থেকে ঢাকার মসনদ নির্ধারিত হবে না’ এই কথাটি শুনিতে বেশ রোমাঞ্চকর, কিন্তু বাস্তবতা হইলো, ঢাকার রাস্তায় বাস চলিবে কি না, কারখানার চাকা ঘুরিবে কি না, তাহা অনেকাংশেই নির্ভর করিতেছে দিল্লির নুমালিগড় রিফাইনারি হইতে আসা তেলের ওপর। হাসনাত সাহেবরা হয়তো ভাবিয়াছিলেন, ৫ আগস্টের পর ভারত হয়তো ভয়ে বা লজ্জায় ব্যবসার দুয়ার বন্ধ করিয়া দিবে। কিন্তু ভারত তো আবেগপ্রবণ বাঙালি নয়, তাহারা পাক্কা বানিয়া। তাহারা জানে, বাংলাদেশে এখন যাহাই ক্ষমতায় থাকুক, তেল তাহাদের লাগিবেই। তাই তাহারা চুপচাপ বসিয়া আছে এবং মুচকি হাসিয়া তেলের ব্যারেলে সিল মারিতেছে। আর এদিকে আমাদের বিপ্লবীরা দিনের বেলা ‘বয়কট ইন্ডিয়া’র ব্যানার ধরিয়া রাখে আর রাতে সেই ইন্ডিয়ান তেল চালিত গাড়িতে চড়িয়া বাড়ি ফেরে।

জুমা বৌদি আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়াছেন। শোনা যাইতেছে, হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং তাহার সতীর্থরা গোপনে এক জরুরি মিটিং ডাকিয়াছেন। আলোচ্য বিষয় হইলো, জনগণকে কী বুঝানো হইবে? এক পক্ষ প্রস্তাব দিয়াছে, বলা হউক যে এই তেল আসলে ‘শুদ্ধিকরণ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আনা হইতেছে। অর্থাৎ বর্ডার পার হওয়ার পর এই তেলের গায়ে জমজমের পানি ছিটাইয়া ইহাকে ‘হালাল’ ও ‘বিপ্লবী’ তেল ঘোষণা করা হইবে। আরেক পক্ষ বলিয়াছে, না, এত প্যাঁচানোর দরকার নাই। সোজা বলা হউক, আমরা ভারতের তেল আনিয়া ভারতকেই ফতুর করিয়া দিতেছি। কারণ আমরা টাকা তো দিব ঋণের টাকায়, সেই টাকা শোধ করিব কি না তার তো কোনো ঠিক নাই! যুক্তি দেখ, বিপ্লবীদের মগজে যে কত উর্বর চিন্তা ঘুরপাক খাইতেছে, তাহা ভাবিলে সাধারণ মানুষের মাথা ভনভন করিবে।

এইদিকে আমজনতার অবস্থা হইলো ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। চালের দাম আকাশচুম্বী, তেলের দাম আগুনে, গ্যাসের সিলিন্ডারে তো হাতই দেওয়া যায় না, আর বাজারে গেলে মনে হয় পকেটে ডাকাতি হইতেছে। ৫ আগস্টের পর মানুষ ভাবিয়াছিল, এবার বুঝি সব সস্তা হইবে। কিন্তু হইলো উল্টা। সাধারণ মানুষ এখন দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলে, শেখ হাসিনার আমলে অন্তত উন্নয়নের একটা দৃশ্যমান রূপ ছিল, মেট্রোরেল ছিল, পদ্মা সেতু ছিল। আর এখন আছে শুধু টকশো, সমন্বয়কদের ধমক আর ভারতীয় তেলের গোপন চালান।

হাসনাত সাহেবের সেই রাতের স্লোগান ‘দিল্লি না ঢাকা, ইউনূসের হেডা’ আসলে বর্তমান পরিস্থিতির এক নির্মম ও কদর্য সত্যকে নির্দেশ করে। অন্তর্বর্তী সরকার যে আসলে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতিতে চলিতেছে, তাহা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। তাহারা একদিকে জনগণকে ভারতবিদ্বেষী আফিম খাওয়াইয়া বুঁদ করিয়া রাখিতেছে, অন্যদিকে নিজেরা দিল্লির সাথে তলে তলে খাতির জমাইতেছে। এই দ্বিমুখী নীতি বেশিদিন চলিবে না। জনগণ যখন বুঝিবে যে ‘বিপ্লব’ শব্দটি আসলে ক্ষমতার হাতবদলের এক চটকদার বিজ্ঞাপন মাত্র, তখন হয়তো নুমালিগড়ের তেল দিয়াও আগুন নেভানো যাইবে না।

সুতরাং, হে বিপ্লবী ভাইসকল, আগামীবার যখন ‘দিল্লি হটাও’ বলিয়া চিৎকার দিবেন, তখন দয়া করিয়া একবার নিজের গাড়ির তেলের ট্যাংকের দিকে তাকাইবেন। হয়তো দেখিবেন, সেখানে দিল্লির তরল আশীর্বাদ ছলছল করিতেছে। আর হাসনাত সাহেব, আপনিও নিশ্চিন্তে ঘুমান। দিল্লি হইতে মসনদ নির্ধারিত হইবে কি না জানি না, তবে আপনার গাড়ির চাকা যে দিল্লির ইশারায় ঘুরিতেছে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হউক, তবে তাহা যেন ভারতীয় ডিজেলে না হয়—এই কামনাই করি। কিন্তু হায়! কপালে যাহার পরনির্ভরতা, তাহার মুখে স্বকীয়তার বুলি যে বড়ই বেমানান।

পরিশেষে বলা যায়, এই ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল শুধু জ্বালানি নয়, ইহা বর্তমান সময়ের এক আয়না। এই আয়নায় হাসনাত আব্দুল্লাহরা নিজেদের মুখ দেখিতে ভয় পাইতেছেন। কারণ সেখানে বিপ্লবীর চেহারার আড়ালে এক সুবিধাবাধী ছায়া ফুটিয়া উঠিতেছে। আর জনগণ? তাহারা শুধু তামাশা দেখিতেছে আর ভাবিতেছে, এই দিন দিন নয়, আরও দিন আছে।

#, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *