ভূমিকম্পের আগে, চলাকালীন ও পরে করণীয়: জরুরি মুহূর্তে সুরক্ষিত থাকার ২০টি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: ভূমিকম্প (Earthquake) এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা কোনো রকম পূর্বাভাস ছাড়াই আঘাত হানে এবং মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিতে পারে। বিশেষত ঘনবসতিপূর্ণ এবং ভূতাত্ত্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য সচেতনতা, পূর্বপ্রস্তুতি ও সঠিক সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা জীবন রক্ষার একমাত্র উপায়। আতঙ্কিত না হয়ে, এই তথ্যবহুল নির্দেশিকাটি পড়ুন ও মনে রাখুন, যেখানে প্রতিটি ধাপে আপনাকে কী কী করতে হবে, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই নির্দেশিকাটি শুধুমাত্র পড়ার জন্য নয়, বরং পরিবার ও কর্মস্থলের সকলের সাথে আলোচনা করে জরুরি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মনে রাখা ও অনুশীলন করা অত্যাবশ্যক। ফ্যাসিস্ট গদি লড়াচ্ছে টাইপ ভুল কোন ধারনা পোষন করবেন না, ভূমিকম্পকে হালকা ভাবে নেওয়া যাবে না।
ভূমিকম্পের আগের প্রস্তুতি (নিরাপত্তার ভিত্তি)
ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য ভূমিকম্প আসার আগে আপনার প্রস্তুতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
১. জরুরি ব্যাগ (Emergency Kit) প্রস্তুত রাখুন:
ভূমিকম্পের পর বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। তাই কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা টিকে থাকার মতো একটি জরুরি ব্যাগ তৈরি করে রাখুন এবং তা সহজে নাগালের মধ্যে রাখুন।
- খাবার ও পানীয়: পর্যাপ্ত বোতলজাত পানি এবং সহজে নষ্ট না হওয়া শুকনো খাবার (বিস্কিট, চিঁড়ে, গুড়) ৩ দিনের জন্য।
- যোগাযোগ ও আলো: ব্যাটারিচালিত রেডিও (খবর জানার জন্য), টর্চলাইট এবং অতিরিক্ত ব্যাটারি, একটি হুইসেল (আটকে পড়লে সংকেত দেওয়ার জন্য)।
- প্রাথমিক চিকিৎসা: প্রাথমিক চিকিৎসা কিট (ব্যান্ডেজ, অ্যান্টিসেপটিক, ব্যথানাশক ওষুধ), পরিবারের প্রয়োজনীয় বিশেষ ওষুধ (যেমন ইনসুলিন, প্রেসার বা হার্টের ওষুধ)।
- অন্যান্য: টাকা, গুরুত্বপূর্ণ নথির ফটোকপি (এনআইডি, প্রেসক্রিপশন), হালকা কম্বল বা চাদর।
২. ঘরের ভেতরের ঝুঁকি হ্রাস করুন:
ভূমিকম্পে বেশিরভাগ আঘাত আসে আসবাবপত্র উলটে পড়া বা ছিটকে আসা বস্তুর কারণে।
- ভারী আসবাব: আলমারি, বুকশেলফ, ফ্রিজ বা অন্যান্য ভারী আসবাবপত্র সম্ভব হলে দেওয়ালের সাথে মজবুত করে বেঁধে (ব্র্যাকেট বা পেরেক ব্যবহার করে) দিন, বা বিছানা থেকে যত সম্ভব দূরে রাখুন।
- বিপজ্জনক স্থান: ঘুম বা বসার জায়গা এমনভাবে নির্বাচন করুন যেন এর আশেপাশে কোনো ভারী বস্তু না থাকে যা ভেঙে বা পড়ে যেতে পারে।
- ঝুলন্ত বস্তু: ভারী ছবির ফ্রেম, আয়না বা ঝাড়বাতি শোবার ঘর বা বসার ঘরের সিলিং থেকে সরিয়ে দিন।
- গ্যাস/বিদ্যুৎ: গ্যাস লাইনের প্রধান সুইচ এবং বিদ্যুতের মেইন সার্কিট ব্রেকার কোথায় আছে তা জেনে রাখুন এবং কম্পন থামার পর তা বন্ধ করার অনুশীলন করুন।
৩. পারিবারিক পরিকল্পনা ও মহড়া:
পরিবারের সকল সদস্যকে নিয়ে একটি জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করুন।
- আশ্রয়ের স্থান: বাড়ির ভেতরে (শক্ত টেবিলের নিচে) এবং বাড়ির বাইরে (খোলা মাঠ বা নিরাপদ স্থান) কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখুন।
- যোগাযোগ: জরুরি নম্বরগুলি (ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল) হাতের কাছে রাখুন। ভূমিকম্পের পর যদি সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, তবে কোথায় মিলিত হবেন (যেমন: কাছের খোলা পার্ক বা স্কুল মাঠ), সেই স্থানটি নির্দিষ্ট করুন।
- মহড়া: বছরে অন্তত দু’বার ‘ড্রপ-কভার-হোল্ড অন’ পদ্ধতির মহড়া দিন।
ভূমিকম্প চলাকালীন করণীয় (সঠিক সময়ে জীবন রক্ষাকারী পদক্ষেপ)
কম্পন শুরু হওয়ার কয়েক সেকেন্ডই আপনার জীবন বাঁচাতে পারে। শান্ত থাকুন এবং দ্রুত কাজ করুন।
১. মূল মন্ত্র: ড্রপ, কভার, হোল্ড অন (Drop, Cover, Hold On)
এটিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পদ্ধতি।
- ড্রপ (Drop): প্রথম কম্পন অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেঝেতে বসে পড়ুন বা হাঁটু গেড়ে বসুন।
- কভার (Cover): আপনার মাথা ও ঘাড় দু’হাত দিয়ে ঢেকে দিন এবং কোনো শক্ত টেবিল, ডেস্ক বা আসবাবপত্রের নিচে আশ্রয় নিন।
- হোল্ড অন (Hold On): আসবাবপত্রটিকে শক্ত করে ধরে থাকুন। কম্পন না থামা পর্যন্ত আশ্রয়স্থল থেকে বের হবেন না। যদি আসবাবটি সরে যায়, তার সাথে সাথে সরে গিয়ে কভার বজায় রাখুন।
২. অবস্থানভিত্তিক করণীয়:
| অবস্থান | করণীয় | যা কখনো করবেন না |
| ঘরের ভেতরে (যদি বের হতে না পারেন) | শক্ত টেবিলের নিচে আশ্রয় নিন। কলাম, বিম বা ইটের গাঁথুনির ঘরের কোণে আশ্রয় নিন। | লিফট ব্যবহার করবেন না, জানালা দিয়ে লাফ দেবেন না। রান্নাঘরে থাকলে চুলা বন্ধ করার চেষ্টা করবেন না। |
| বহুতল ভবনে | সিঁড়ি বা লিফটের দিকে দৌড়াবেন না। আপনার বর্তমান ফ্লোরের সবচেয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিন। | বারান্দা, কাঁচের জানালা, আলমারি বা ঝুলন্ত ফ্যানের কাছে দাঁড়াবেন না। |
| ঘরের বাইরে | উঁচু ভবন, গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, লাইটপোস্ট বা সাইনবোর্ড থেকে দূরে খোলা জায়গায় (যেমন মাঠ) দ্রুত যান। | দালানের নিচে বা পাশে দাঁড়াবেন না। রাস্তায় ছোটাছুটি করবেন না। |
| গাড়িতে | শান্তভাবে ধীরে ধীরে গাড়ি থামিয়ে দিন। ওভারব্রিজ, ফ্লাইওভার বা টানেলের নিচে থামবেন না। কম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই থাকুন। | গাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবেন না। অন্য গাড়ির চলাচলে বাধা সৃষ্টি করবেন না। |
| ভিড়ের জায়গায় (মার্কেট, সিনেমা হল) | আতঙ্কিত না হয়ে, দু’হাতে মাথা ঢেকে বসে পড়ুন। বের হওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি করবেন না। | দরজার সামনে বা সরু পথে ভিড় করবেন না। |
| উপকূলীয় এলাকায় | কম্পন বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত উঁচু ও নিরাপদ স্থানে (অন্তত ১০-২০ মিটার উঁচু) চলে যান। | সমুদ্রের ধারে বা নদীতে থাকবেন না। সুনামির জন্য অপেক্ষা করবেন না। |
আরো পড়ুন: আগুন লাগলে করণীয়: জীবন বাঁচাতে জেনে নিন জরুরি পদক্ষেপসমূহ
ভূমিকম্পের পরে করণীয় (উদ্ধার ও পুনর্বাসন)
কম্পন থেমে যাওয়ার পরেও বিপদ শেষ হয়ে যায় না। আফটারশক এবং বিভিন্ন কারণে ঝুঁকি থেকে যায়।
১. নিজেকে ও চারপাশকে যাচাই করুন:
- নিরাপদ প্রস্থান: দরজা-জানালা খুলে দিন। আতঙ্কিত না হয়ে শান্তভাবে সিঁড়ি ব্যবহার করে বাইরে খোলা জায়গায় চলে যান।
- বৈদ্যুতিক ও গ্যাস সংযোগ: দ্রুত বৈদ্যুতিক মেইন সুইচ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিন (যদি না করতে পারেন তবে দ্রুত সেখান থেকে সরে যান)। কোনো প্রকার সুইচ টিপবেন না বা আগুন জ্বালাবেন না, কারণ গ্যাসের পাইপ ফেটে থাকলে বিস্ফোরণ হতে পারে।
- আহতদের সাহায্য: নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আশেপাশের আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিন। গুরুতর আহতদের জন্য জরুরি সেবার অপেক্ষা করুন।
২. ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়লে:
ধৈর্য এবং সাহস হারাবেন না। আপনার জীবন রক্ষাকারী কিছু টিপস:
- হুইসেল ব্যবহার: আপনার হুইসেলটি ব্যবহার করে উদ্ধারকারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করুন। হুইসেল না থাকলে ক্রমাগত চিৎকার না করে থেমে থেমে সংকেত দিন।
- ধুলো এড়ান: ধুলো শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভেতরে প্রবেশ এড়াতে কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখুন।
- নড়াচড়া কম: যদি শরীরের কোনো অংশ ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে, তবে রক্তক্ষরণ বা অতিরিক্ত আঘাত এড়াতে কম নড়াচড়া করুন।
- সংকেত: একটি শক্ত বস্তু (যেমন পাথর বা লোহার টুকরা) দিয়ে দেওয়ালে বা পাইপে আঘাত করে উদ্ধারকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করুন।
- ফোন: সম্ভব হলে জরুরি সেবায় ফোন করুন এবং আপনার অবস্থান জানান।
৩. আফটারশক ও পুনরুদ্ধার:
- আফটারশক: বড় ভূমিকম্পের পর ছোট ছোট আফটারশক খুবই স্বাভাবিক। যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় আশ্রয় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন।
- ক্ষতিগ্রস্ত ভবন: যদি আপনার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে ফায়ার সার্ভিস বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সেটির ভেতরে প্রবেশ করবেন না।
- যোগাযোগ: ফোন লাইন ব্যস্ত রাখবেন না। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য অন্যদের সুযোগ দিন। রেডিওর মাধ্যমে সরকারি নির্দেশনা ও জরুরি খবর শুনতে থাকুন।
এই নির্দেশিকাটি প্রতিটি ধাপে আপনার এবং আপনার প্রিয়জনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তুতি আপনার মানসিক চাপ কমাবে এবং জীবন রক্ষার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। আজই আপনার জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত করুন এবং পারিবারিক মহড়া শুরু করুন।
ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় একমাত্র হাতিয়ার হলো সচেতনতা ও প্রস্তুতি।