মাটি খুঁড়লেই নাকি পাওয়া যাবে পারমাণবিক বোমা! জানুন ডাকসু নেতা মোসাদ্দেক আলির আজব দাবির পেছনের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা ও বিশ্লেষণ।
বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: আমাদের ছোটবেলায় একটা খুব জনপ্রিয় কৌতুক ছিল। এক লোক বাজারে গিয়ে বলছিল, ‘ভাই, আমার কাছে বিমানে ওঠার টিকিট নেই, কিন্তু বিমান চালানোর সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল মুখস্থ আছে, আমাকে কি পাইলট বানাবেন?’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক মোসাদ্দেক আলির সাম্প্রতিক বক্তব্য শোনার পর মনে হলো, কৌতুকটি বোধহয় আর কৌতুক নেই, এটি এখন আমাদের জাতীয় রাজনীতির অংশ হয়ে গেছে। ডাকসু নেতার দাবি, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পাহাড়ে নাকি এত ইউরেনিয়াম আছে, যা দিয়ে ভারতকে অসংখ্যবার ‘উড়িয়ে দেওয়া’ সম্ভব। আহা! কী চমৎকার গাণিতিক হিসাব। যেন কুলাউড়ার পাহাড়টা একটা রেডিমেড ডিনামাইট, শুধু সলতেতে একটু আগুন ধরিয়ে দিলেই পাশের বাড়ির ছাদ উড়ে যাবে। তিনি আরও বলেছেন, ভবিষ্যতের সরকারের যেন ‘মেরুদণ্ড’ থাকে সেই ইউরেনিয়াম তোলার। অর্থাৎ, ওনার মতে ইউরেনিয়াম তোলা আর পুকুর থেকে শাপলা তোলা মোটামুটি একই ক্যাটাগরির কাজ, শুধু মাঝখানে একটু মেরুদণ্ড শক্ত থাকলেই চলে।
এই বক্তব্যটি শোনার পর দেশের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্ররা সম্ভবত নিজেদের সার্টিফিকেটগুলো ছিঁড়ে ফেলার কথা ভাবছে। কারণ, এতদিন তারা জানত যে প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়াম আর নিউক্লিয়ার বোমার ইউরেনিয়াম এক জিনিস নয়। প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়ামে আইসোটোপ ইউ-২৩৫ থাকে মাত্র শূন্য দশমিক সাত দুই শতাংশ। আর বোমা বানাতে গেলে সেটাকে নব্বই শতাংশের ওপরে ‘এনরিচ’ করতে হয়। এই এনরিচমেন্ট প্রক্রিয়াটি এতটাই জটিল এবং ব্যয়বহুল যে, ইরান গত কয়েক দশক ধরে চেষ্টা করেও পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার ঠেলায় কাহিল অবস্থায় আছে। আমেরিকা, ইসরাইল আর ইউরোপের বাঘা বাঘা দেশগুলো দূরবীক্ষণ যন্ত্র লাগিয়ে বসে থাকে, কোথায় কে একটু সেন্ট্রিফিউজ ঘোরাচ্ছে। অথচ আমাদের সাহিত্য সম্পাদক ভাবছেন, কুলাউড়ায় কোদাল চালালেই সেখান থেকে চকচকে নিউক্লিয়ার বোমা বের হয়ে আসবে, আর আমরা সেটা ছুড়ে দিয়ে প্রতিবেশীকে ‘উড়িয়ে’ দেব। যেন ব্যাপারটা এমন, বাজার থেকে আলু কিনে এনে সেটা দিয়ে সরাসরি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বানিয়ে ফেলা।
সবচেয়ে মজার এবং একইসাথে ভয়ের ব্যাপার হলো, এই বক্তব্যটি এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদের একজন নেতার কাছ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড, দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। সেখানকার একজন সাহিত্য সম্পাদক যখন বিজ্ঞান আর কল্পকাহিনির পার্থক্য বুঝতে পারেন না, তখন সাধারণ মানুষের আর দোষ কী? তিনি হয়তো ভেবেছেন, ইউরেনিয়াম হলো এক ধরনের শক্তিশালী মরিচের গুঁড়া, যা ছিটিয়ে দিলেই শত্রু পক্ষ জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাবে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট বোঝা যায়, বিজ্ঞান শিক্ষার দৌড় সম্ভবত ক্লাস এইট বা নাইনের সাধারণ বিজ্ঞান বইয়ের আগেই থেমে গেছে। অথবা তিনি হয়তো সেই দলের লোক, যারা বিশ্বাস করে বাংলাদেশে দুইদিন পর পর জ্বালানিবিহীন গাড়ি আবিষ্কৃত হয় এবং পানি দিয়ে রকেট চালানো সম্ভব। আমাদের দেশে বিজ্ঞানের প্রতি এই যে একটা অদ্ভুত অনাস্থা এবং তার বদলে আবেগের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, এটাই আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। আমরা ফিজিক্সের সূত্র মানি না, কিন্তু ফিজিক্স ব্যবহার করে বানানো স্মার্টফোনে লাইভে এসে অবাস্তব সব দাবি করতে আমাদের বাধে না।
সাহিত্য সম্পাদকের এই ‘উড়িয়ে দেওয়া’র তত্ত্বে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টিও বেশ পরিষ্কার। তিনি বলেছেন, প্রতিবেশী কখনো বন্ধু হয় না। তার যুক্তি, বন্ধু হলে তো মানচিত্র এক হয়ে যেত। বাহ! কী অকাট্য যুক্তি। সেই হিসেবে তো কাজাখস্তানের উচিত ছিল এতদিনে রাশিয়া বা চীনকে উড়িয়ে দেওয়া। কারণ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইউরেনিয়াম মজুদ আছে কাজাখস্তানে। কই, তারা তো কোনোদিন বলেনি যে, ‘আমাদের কাছে ইউরেনিয়াম আছে, তাই পাশের দেশকে দেখে নেব।’ বরং তারা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-এর কড়া নজরদারিতে থেকে শান্তিপূর্ণভাবে সেই সম্পদ ব্যবহারের চেষ্টা করছে। কারণ তারা জানে, ইউরেনিয়াম থাকলেই সেটা দিয়ে বোমা বানানো যায় না, আর বোমা বানানোর চেষ্টা করলেই সারা বিশ্ব তাদের একঘরে করে দেবে। কিন্তু আমাদের নেতা এসব ‘তুচ্ছ’ আন্তর্জাতিক আইন বা নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করেন না। তার কাছে মনে হয়, জাতিসংঘের আইএইএ হলো গ্রামের সালিশি বৈঠক, যেখানে একটু ধমক দিলেই কাজ হয়ে যাবে। তিনি হয়তো জানেন না, কোনো দেশে ইউরেনিয়াম খনির সন্ধান মিললে বা উত্তোলনের চেষ্টা করলেই আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা সেখানে পাহারায় বসে যান। এটা আলু-পটলের চাষ নয় যে কেউ টেরও পাবে না।
এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা শুধু হাস্যরসের জন্ম দেয় না, বরং দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করে। প্রতিবেশী দেশের সাথে আমাদের সম্পর্ক ন্যায্যতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত, এটা সবাই মানে। কিন্তু সেই ন্যায্যতার দাবি আদায়ের পদ্ধতি যদি হয় ‘বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া’র হুমকি, তবে সেটাকে আর যা-ই হোক, সুস্থ মস্তিষ্কের চিন্তা বলা যায় না। একজন ছাত্রনেতা, যার কাঁধে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব, তিনি যখন প্রকাশ্য জনসভায় এমন হিংসাত্মক এবং অবৈজ্ঞানিক কথা বলেন, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা আসলে কাদের হাতে নেতৃত্বের ভার দিচ্ছি? এদের মেধা ও পড়াশোনার গভীরতা আসলে কতটুকু? সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তার তো অন্তত শব্দের ওজন বোঝার কথা। ‘উড়িয়ে দেওয়া’, ‘ধ্বংস করা’ এই শব্দগুলো কোনো সভ্য সমাজের প্রতিনিধির মুখে মানায় না। কূটনীতির ভাষা আর মাস্তানির ভাষা যে এক নয়, এই সাধারণ জ্ঞানটুকু যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ছাত্রনেতার না থাকে, তবে জাতির ভবিষ্যৎ আসলেই অন্ধকার।
আসলে সমস্যাটা শুধু ওই নেতার একার নয়, সমস্যাটা আমাদের সামগ্রিক মননশীলতার। আমরা আবেগে ভাসতে পছন্দ করি। কেউ একজন বলল, ‘আমাদের পাহাড়ে সোনার খনি আছে’, আর আমরা অমনি বিজ্ঞানের তোয়াক্কা না করে সেটা দিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। বিজ্ঞান যে আবেগের ধার ধারে না, সেটা আমরা ভুলে যাই। প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামকে ওয়েপন গ্রেড বা অস্ত্র তৈরির উপযোগী করতে যে প্রযুক্তির দরকার, তা বাংলাদেশের নেই এবং নিকট ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনাও কম। আর যদি সেই প্রযুক্তি জোগাড় করার চেষ্টাও করা হয়, তবে বাংলাদেশ মুহূর্তের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার মতো একঘরে হয়ে যাবে। তখন ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি সব বন্ধ হয়ে যাবে। তখন ওই ইউরেনিয়াম ধুয়ে পানি খাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। কিন্তু এসব জটিল সমীকরণ বোঝার মতো ধৈর্য বা প্রজ্ঞা কি আমাদের সেই নেতাদের আছে? মনে তো হয় না। তাদের কাছে রাজনীতি মানেই হলো গরম গরম বক্তৃতা আর প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সস্তা হুমকি।
পরিশেষে বলতে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের কাছ থেকে জাতি আরও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে। ইউরেনিয়াম নিয়ে ডাকসু নেতা মোসাদ্দেক আলির মতো ফ্যান্টাসিতে না ভুগে তাদের উচিত একটু লাইব্রেরিতে যাওয়া, দু-চারটা বই পড়া। অন্তত গুগল বা উইকিপিডিয়া ঘেঁটে দেখা যে ইউরেনিয়াম আসলে কী এবং এটা দিয়ে কী করা যায় আর কী করা যায় না। নতুবা, ভবিষ্যতে হয়তো শুনব, আমাদের কোনো লালবদর নেতা দাবি করছেন যে, বঙ্গোপসাগরের পানি দিয়ে হাইড্রোজেন বোমা বানিয়ে পুরো প্রশান্ত মহাসাগর শুকিয়ে ফেলা হবে। মূর্খতা যখন লোকদেখানো সাহসের সাথে মিশে যায়, তখন তা বিনোদনের উৎস হতে পারে, কিন্তু জাতির জন্য তা বিপজ্জনক। আশা করি, আমাদের নেতাদের ‘মেরুদণ্ড’ শক্ত হওয়ার পাশাপাশি মস্তিষ্কের নিউরনগুলোও একটু সচল হবে। কারণ, শুধু মেরুদণ্ড দিয়ে ভার বহন করা যায়, কিন্তু দেশ বা জাতি চালাতে গেলে মাথার ঘিলুটাও সমান জরুরি।