পিটার হাসের ব্যবসায়িক কামব্যাক ও ড. ইউনূসের ৫০ হাজার কোটি টাকার সংস্কার

পিটার হাসের ব্যবসায়িক কামব্যাক ও ড. ইউনূসের ৫০ হাজার কোটি টাকার সংস্কার। Peter D. Haas's Business Comeback and Dr. Yunus's 50,000 Crore Reform. পিটার হাসের ব্যবসায়িক কামব্যাক ও ড. ইউনূসের ৫০ হাজার কোটি টাকার সংস্কার। Peter D. Haas's Business Comeback and Dr. Yunus's 50,000 Crore Reform.

৫০ হাজার কোটি টাকার সংস্কার নামক লুটপাটে বাজার থেকে গ্যাস সিলিন্ডার হাওয়া: এলএনজির পর এলপিজি নিয়ে ড. ইউনুস-হাসের নতুন খেলা!

বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: বাংলার আকাশ-বাতাস এখন আর ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করে না, বরং  বাতাসে নতুন এক ঘ্রাণ যুক্ত হয়েছে, সেটি হলো ‘সংস্কার’-এর ঘ্রাণ। এই সংস্কারের ঠেলায় রান্নাঘরের চুলা এখন মিউজিয়ামের শোপিস হয়ে যাওয়ার উপক্রম। গৃহিণীরা এখন গ্যাসের চুলার নব ঘোরাতে ঘোরাতে হাতের কব্জি ক্ষয়ে ফেলছেন, কিন্তু পাইপলাইন দিয়ে গ্যাস আসার বদলে আসছে শুধুই হিসহিস শব্দ, যা শুনলে মনে হয় কোনো বিষধর সাপ পাইপের ওপাশে বসে ফোঁসফাস করছে। অথচ এই হাহাকারের মাঝেও কিছু মানুষের মুখে চওড়া হাসি। সেই হাসির ঔজ্জ্বল্য এতটাই বেশি যে, তা সাগরের বুকে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে শুরু করে ঢাকার অভিজাত পাড়ার এসি রুম পর্যন্ত আলোকিত করে রেখেছে। আমজনতা যখন এক ফোঁটা গ্যাসের জন্য সিলিন্ডারের দোকানের সামনে লাইন দিয়ে মারামারি করছে, তখন পর্দার আড়ালে চলছে অন্য নাটক, যার পরিচালক আমাদের ‘শান্তির সওদাগর ড. ইউনূস’ এবং প্রধান অভিনেতা একদা ভিসার ভয় দেখানো মার্কিন ভদ্রলোক ‘পিটার হাস’।

দৃশ্যপটটা একটু গভীর থেকে দেখা যাক। গত ১৭ মাসে দেশের মানুষ বুঝে গেছে, পেটে ভাত না জুটলেও ‘সংস্কার’ জুটবে অঢেল। আর সেই সংস্কারের প্রথম ধাপ হলো, দেশীয় সবকিছুকে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করা। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, আপনার নিজের গরুর দুধ দোহন করতে গেলে গরু বালতিতে লাথি মারে, তাই এখন থেকে আমেরিকা থেকে প্যাকেটজাত দুধ এনে খেতে হবে। ৫ আগস্ট পরবর্তি সময়ে সাগরের বুকে একের পর এক দেশি জাহাজে আগুন লাগার ঘটনাকে সাধারণ মানুষ দুর্ঘটনা ভাবলেও, যারা একটু ঘাড়ত্যাড়া, তারা মুচকি হাসছেন। তাদের মতে, দেশি জাহাজে আগুন লাগাটা আসলে একটা মেসেজ। মেসেজটা হলো, ‘তোমরা গ্যাস আনলে আগুন লাগবেই, তার চেয়ে বরং আমেরিকানদের হাতে ছেড়ে দাও।’ আর এই আগুনের উত্তাপেই পোক্ত হচ্ছে এক লাখ কোটি টাকার এলএনজি বাণিজ্য।

যিনি একসময় ঢাকায় বসে ভিসানীতির ছড়ি ঘোরাতেন, সেই পিটার হাস সাহেব এখন আর কূটনীতিক নন, তিনি এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। ডিপ্লোম্যাসির জ্যাকেট খুলে তিনি এখন গায়ে চাপিয়েছেন কর্পোরেট ব্লেজার। ‘এক্সিলারেট এনার্জি’র উপদেষ্টা হয়ে তিনি আবার ফিরে এসেছেন বঙ্গমুলুকে। তবে এবার আর গণতন্ত্র শেখাতে নয়, বরং ‘গ্যাস-তন্ত্র’ কায়েম করতে। তার কোম্পানি আগামী পনেরো বছর ধরে একচেটিয়া এলএনজি সরবরাহ করবে, এমন পাকাপাকি কথাই হয়ে গেছে। আর এই চুক্তির অঙ্কটা শুনলে সাধারণ মানুষের হার্টবিট মিস হওয়ার জোগাড়, এক লাখ কোটি টাকা!

এখন প্রশ্ন হলো, এলএনজির পর এলপিজির দিকে কেন নজর পড়লো? উত্তরটা খুব সোজা। এলএনজি হলো পাইকারি ব্যবসা, আর এলপিজি হলো খুচরা। বড়লোকের পকেটে হাত ঢোকানোর পর গরিবের পকেটের দশ টাকাটাও কেন ছেড়ে দেওয়া হবে? তাই তো সাগরে ভাসমান এলপিজি জাহাজগুলোতেও রহস্যময় আগুন দেখা গিয়েছিল। দেশি সাপ্লাই চেইন ভেঙে দিতে পারলেই কেল্লাফতে। তখন বাধ্য হয়ে সরকারকে বলতে হবে, ‘ওহে পিটার, তুমিই ভরসা। তোমার আমেরিকান এলপিজি ছাড়া আমাদের চুলা আর জ্বলবে না।’ আর এই সুযোগে এলপিজির বাজারটাও চলে যাবে সেই একই সিন্ডিকেটের পেটে।

কিন্তু জনগণ যখন গ্যাসের অভাবে কাঁচা লাউ চিবিয়ে খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমাদের নোবেলজয়ী প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস মহোদয় কী করছেন? তিনি কি খুব চিন্তিত? তার কপালে কি চিন্তার ভাঁজ পড়েছে? উহু, একদমই না। তিনি এখন মহাব্যস্ত। তবে গ্যাসের জন্য নয়, তিনি ব্যস্ত নিজের লাইসেন্স আর কর মওকুফের ফাইল গোছাতে। জুলাই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেই নিজের ৬৬৬ কোটি টাকার কর মওকুফ করিয়ে নিয়েছেন। ৬৬৬ সংখ্যাটা কেমন যেন শয়তানি শয়তানি লাগে, তাই না? তবে আমাদের শান্তিবুড়োর কাছে এটা শুধুই একটা সংখ্যা। তিনি হয়তো ভাবছেন, ‘আমি বিশ্বকে শান্তি দিয়েছি, এখন দেশ আমার বিল পরিশোধ করুক।’ এরপর গ্রামীণের নামে একেক পর এক লাইসেন্স অনুমোদন দিয়ে গেলেন। লাইসেন্স বাগিয়ে নেওয়ার এই ইঁদুর দৌড়ে তিনি এখন উসাইন বোল্ট। আমজনতা যখন লাইনে দাঁড়িয়ে ঘাম ঝরাচ্ছে, তিনি তখন এসি রুমে বসে ক্যালকুলেটরে নিজের লাভের হিসাব কষছেন।

ভাবুন তো একবার দৃশ্যটা, একদিকে পিটার হাস মুচকি হেসে বলছেন, ‘হোয়াট ইজ আপ বাংলাদেশ? গ্যাস লাগবে? ডলার বের করো।’ অন্যদিকে আমাদের ডক্টর ইউনূস সাহেব চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বলছেন, ‘তোমরা ধৈর্য ধরো, সংস্কার হচ্ছে। গ্যাস না থাকলে কী হয়েছে? তোমরা তো স্বাধীন! স্বাধীনতার স্বাদ কি গ্যাসের চেয়ে কম?’ এই দুই মহারথীর মাঝখানে পড়ে সাধারণ মানুষের অবস্থা চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া তেলাপোকার মতো। তাদের পেটে খিদে, চুলায় আগুন নেই, কিন্তু মনে আছে অফুরন্ত ‘সংস্কারের’ আশা। তবে এই আশা দিয়ে তো আর ভাত সেদ্ধ করা যায় না!

ষড়যন্ত্ৰের জালটা এত সূক্ষ্ম যে, তা খালি চোখে ধরা পড়ে না। এলপিজি সংকটের নামে জনগণের পকেট থেকে যে ৫০ হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়া হলো এর ছিটেফোঁটাও কি দেশে থাকবে? নাকি পুরোটাই পাচার হয়ে যাবে বিদেশি ব্যাংকের ভল্টে? এক্সিলারেট এনার্জি বা পিটার হাসের কোম্পানিকে ‘জামাই আদর’ করে কাজ দেওয়ার পেছনের রহস্য কী? কেন আন্তর্জাতিক বাজারে টেন্ডার ডেকে প্রতিযোগিতা করা হলো না? কেন স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার নামে নির্দিষ্ট একটি কোম্পানিকেই বেছে নেওয়া হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই আপনি হয়ে যাবেন ‘সংস্কারবিরোধী’। তখন হয়তো আপনার নামেও জুলাই হত্যা মামলা ঠুকে দেওয়া হবে। কারণ, এই ‘মহামানব’দের রাজত্বে প্রশ্ন করা বারণ, শুধু মেনে নেওয়া আর পকেট খালি করাই নিয়ম।

এলপিজি সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে হু হু করে। ব্যবসায়ীরা বলছেন ডলার নেই, এলসি খোলা যাচ্ছে না। অথচ ১ লাখ কোটি টাকার এলএনজি চুক্তির সময় ডলারের চিন্তা করা হয় না! আসলে পুরোটাই একটা সাজানো নাটক। চিত্রনাট্য লিখেছেন বিদেশি প্রভুরা, আর পরিচালনা করছেন আমাদের দেশি ‘হিরো’রা। উদ্দেশ্য একটাই, মানুষকে জিম্মি করা। মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে বলবে, ‘ভাই, যেখান থেকেই পারো গ্যাস আনো, যত দাম লাগে দেব,’ ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হবে পিটার হাসের কোম্পানি। তারা বলবে, ‘চিন্তা নেই, আমরা এসেছি উদ্ধার করতে।’ আর এই উদ্ধারের ফি হিসেবে তারা নিয়ে যাবে আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা।

মজার ব্যাপার হলো, যারা একসময় সামান্য পেঁয়াজের দাম বাড়লে রাজপথ গরম করতেন, সেই সুশীল সমাজ এখন মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তাদের কি গ্যাসের সমস্যা হচ্ছে না? নাকি তাদের বাসায় স্পেশাল পাইপলাইন দিয়ে ‘সংস্কারকৃত’ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে? আসলে তারাও বুঝে গেছেন, এখন কথা বললে ‘প্রজেক্ট’ পাওয়া যাবে না। তাই সবাই মিলে এখন ‘ইয়েস স্যার, ভেরি গুড স্যার’ জপছেন। আর ওদিকে ডক্টর ইউনুস নিজের প্রতিষ্ঠানের একের পর এক লাইসেন্স নবায়ন আর কর মওকুফের কাগজ সই করতে করতে কলমের কালি শেষ করে ফেলছেন। তার কাছে এখন অগ্রাধিকার হলো নিজের গ্রামীণ সাম্রাজ্য রক্ষা করা, দেশের মানুষের পেট রক্ষা করা নয়।

ড. ইউনূস হয়তো ভাবেন, নোবেল পুরস্কার তাকে এমন এক ইনডেমনিটি দিয়েছে যে, তিনি সাত খুন মাফ পেলেও কেউ কিছু বলবে না। তাই তো তিনি অবলীলায় আমেরিকান কোম্পানির হাতে দেশের জ্বালানি খাতের চাবি তুলে দিচ্ছেন। পিটার হাসের সাথে তার এই সখ্যতা কি শুধুই বন্ধুত্বের? নাকি এর পেছনে আছে কোনো বড় লেনদেন? রাজনীতি আর ব্যবসার এই মিশেল বড়ই অদ্ভুত। এখানে কেউ কারো বন্ধু নয়, সবাই সবার স্বার্থের অংশীদার। পিটার হাস চান ব্যবসা, আর ইউনুস চান ক্ষমতা ও নিজের প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা। এই দুইয়ের মিলনে বলি হচ্ছে আমজনতা।

এলপিজির কৃত্তিম সংকট হয়তো কেবল শুরু। এরপর হয়তো দেখা যাবে, আমাদের তিতাস গ্যাস বা কর্ণফুলী গ্যাসের পাইপলাইনেও অজানা কারণে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তখন বলা হবে, ‘সরকারি ব্যবস্থাপনা অচল, সব প্রাইভেটাইজ করে দাও।’ আর সেই প্রাইভেটাইজেশনের নামে সব তুলে দেওয়া হবে বিদেশি কোম্পানির হাতে। তখন আমাদের রান্নাঘরের নিয়ন্ত্রণ থাকবে ওয়াশিংটনে বসে থাকা কোনো এক হাসিমুখের কর্পোরেট বসের হাতে। তিনি যখন চাইবেন, তখন আমাদের চুলা জ্বলবে; যখন চাইবেন না, তখন আমরা উপোস থাকব। একেই বলে সত্যিকারের গ্লোবালাইজেশন!

শেষমেশ এই প্রহসনের শেষ কোথায়, তা কেউ জানে না। তবে এটুকু নিশ্চিত, আমাদের কপালে আরও দুর্ভোগ আছে। গ্যাসের দাম বাড়বে, সিলিন্ডার উধাও হবে, আর আমরা টিভির পর্দায় দেখব আমাদের মহান সংস্কারকরা হাসিমুখে বিদেশি প্রভুদের সাথে করমর্দন করছেন। ডক্টর ইউনুস হয়তো তখন বলবেন, ‘তোমরা গ্যাস পাচ্ছ না, তাতে কী? তোমরা তো বিশ্বসেরা সংস্কার পাচ্ছ! এই সংস্কার দিয়ে পেট না ভরলেও মন তো ভরবে!’ আর পিটার হাস তখন আড়ালে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলবেন, ‘গুড জব, মাই ফ্রেন্ড। বিজনেস ইজ বুমিং!’

জনগণের এখন একটাই কাজ, হয় কাঁচা খাওয়া অভ্যাস করা, নয়তো রোদে দাঁড়িয়ে সূর্যের তাপে রান্না করার প্রযুক্তি আবিষ্কার করা। কারণ, যে দেশে নোবেলজয়ী শাসক নিজের কর মওকুফ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন আর বিদেশি বেনিয়ারা জাহাজে আগুন লাগিয়ে ব্যবসা করে, সে দেশে গ্যাসের আশা করাটাই বিলাসিতা। আমাদের রান্নাঘর এখন আর আমাদের নেই, তা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ঘুঁটি। আর আমরা? আমরা সেই দাবার বোর্ডের এক একটা অসহায় সৈনিক, যাদের কাজ শুধু বলি হওয়া।

তবুও, আসুন আমরা হাসি। কারণ, হাসতে তো আর গ্যাস লাগে না, ট্যাক্সও লাগে না, অন্তত এখন পর্যন্ত!

#, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #, #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *