ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সর্বমিত্র চাকমা কর্তৃক শিশুদের কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনা নিয়ে তোলপাড়। এটি কি নিছক শাসন নাকি শিশু নির্যাতন?
বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: ইতিহাস সাক্ষী, মহৎ কাজের কদর এই জাতি কখনোই তাৎক্ষণিকভাবে দিতে জানে না। গ্যালিলিও যখন বলেছিলেন পৃথিবী গোল, তাকেও কি আর ফুলের মালা দেওয়া হয়েছিল? দেওয়া হয়নি। সক্রেটিসকে পান করতে হয়েছিল হেমলক বিষ। ঠিক তেমনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ গালিচায় মোড়ানো খেলার মাঠে যখন একদল বিভ্রান্ত শিশু তাদের অমূল্য শৈশবকে শুধুমাত্র অহেতুক ‘দৌড়াদৌড়ি’ আর ‘গোল্লাছুট’ খেলে নষ্ট করছিলো, তখন ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন ছাত্র সংসদের জাঁদরেল নেতা ও সমাজ সংস্কারক সর্বমিত্র চাকমা। হাতে তার ছিল ন্যায়ের দণ্ড, চোখে ছিল সমাজ সংস্কারের জ্বলন্ত দৃষ্টি এবং হৃদয়ে ছিল শিশুদের প্রতি এক অদ্ভুত, অব্যক্ত ভালোবাসা, যে ভালোবাসার ভাষা বুঝতে হলে কানের লতি শক্ত করে ধরতে হয়। তিনি চেয়েছিলেন এই শিশুগুলোকে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে, আর তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন হাজার বছরের পরীক্ষিত ও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শরীরচর্চা পদ্ধতি ‘কান ধরে উঠবস’। কিন্তু হায়! ডিজিটাল যুগের ট্রমা-বিলাসী জনতা সেই মহৎ প্রচেষ্টাকে নাম দিলো ‘নির্যাতন’। সোশ্যাল মিডিয়ার বাণে বিদ্ধ হয়ে অবশেষে এই মহান গবেষককে তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর চিন্তা পর্যন্ত করতে হলো। অথচ তিনি চেয়েছিলেন একটি সুশৃঙ্খল, কানমলা-সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপহার দিতে।
ঘটনার সূত্রপাত এক স্নিগ্ধ সকালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ তখন পাখির কিচিরমিচির আর শিশুদের কোলাহলে মুখরিত। কিন্তু এই কোলাহল কি শুধুই আনন্দের? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র? সর্বমিত্র চাকমা, যার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সব সময় সমাজের অসংগতি খুঁজে বেড়ায়, তিনি ঠিকই ধরে ফেললেন বিষয়টা। তিনি দেখলেন, একদল শিশু কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়াই, কোনো প্রকার সরকারি ফি জমা না দিয়েই, এবং সবচেয়ে বড় কথা, ডাকসুর কোনো নেতার কাছ থেকে টোকেন সংগ্রহ না করেই দিব্যি বল লাথি মারছে। কী ভয়ানক স্পর্ধা! বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি উচ্চশিক্ষার পবিত্র আঙ্গিনায়, যেখানে বড় ভাইয়েরা সারাদিন পলিটিক্স আর গেস্টরুমে ব্যস্ত থাকেন, সেখানে একদল পিচ্চি-পাচ্চা এসে বল পেটাবে, এটা কি মেনে নেওয়া যায়? এটি কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ঐতিহ্যের সঙ্গে যায়? সর্বমিত্রের মনে জেগে উঠল নৈতিকতার এক প্রবল ঝড়। তিনি ভাবলেন, আজ যদি এদের ছেড়ে দেওয়া হয়, কাল এরা ভিসি চত্বরে এসে ক্রিকেট খেলবে, পরশু হয়তো কার্জন হলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাডমিন্টন খেলার আবদার করে বসবে। এই অনাচার অঙ্কুরেই বিনাশ করতে হবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। তিনি সঙ্গে নিলেন তার বিশ্বস্ত ‘ডিসিপ্লিনারি স্টিক’ বা শৃঙ্খলা দণ্ড। এই দণ্ডটি সাধারণ কোনো লাঠি নয়। এটি বিশেষ অর্ডারে সুন্দরবনের গেওয়া কাঠ দিয়ে তৈরি, যা হাতে নিলে অটোমেটিক শরীরে দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের সঞ্চার হয়। তিনি মাঠে প্রবেশ করলেন অনেকটা সিনেমার নায়কের মতো স্লো-মোশনে। তার আবির্ভাবে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। শিশুরা, যারা কিনা তখনো জানত না তাদের জীবনের মোড় ঘুরে যেতে বসেছে, তারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সর্বমিত্র কালক্ষেপণ করলেন না। তিনি কোনো প্রকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় না গিয়ে সরাসরি অ্যাকশনে চলে গেলেন। তিনি শিশুদের লাইন ধরে দাঁড় করালেন। তারপর শুরু হলো কান ধরে উঠবস।
কেন কান ধরে উঠবস? কেন অন্য কোনো ব্যায়াম নয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট ‘কান ও উঠবস বিশারদ’ এবং নীলক্ষেত মোড়ের ফিলোসফার জনাব সলিমুল্লাহর সঙ্গে। তিনি তার চশমা মুছতে মুছতে জানালেন, “দেখুন, কান হচ্ছে মানুষের শরীরের ওয়াইফাই রাউটার। কানের লতিতে চাপ দিলে সরাসরি মস্তিষ্কের বিবেকের ঘরে সিগন্যাল চলে যায়। আর উঠবস করলে পায়ের মাসল শক্ত হয়, যা ভবিষ্যতে বিসিএস লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য খুবই জরুরি। সর্বমিত্র সাহেব আসলে এই শিশুদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের কথা ভেবেই তাদের বিনামূল্যে এই হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং বা এইচআইআইটি করাচ্ছিলেন। কিন্তু আফসোস, আমরা তার এই ভিশনারি প্রজেক্ট বুঝতে পারলাম না।”
ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সর্বমিত্র অত্যন্ত যত্ন সহকারে গুনছিলেন, কে কতবার উঠবস করছে। তিনি এতটাই পারফেকশনিস্ট যে, কারো উঠবস যদি ৯০ ডিগ্রি কোণে না হতো, তিনি পরম মমতায় হাতে থাকা লাঠিটি উঁচিয়ে তাদের সঠিক জ্যামিতিক কোণ বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। অথচ নিন্দুকেরা বলছে, তিনি নাকি ভয় দেখাচ্ছিলেন! কী হাস্যকর কথা! একজন ছাত্রনেতা, যিনি কিনা শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত (কিংবা নির্বাচিত বলে কথিত), তিনি কেন শিশুদের ভয় দেখাবেন? তিনি তো আসলে তাদের শেখাচ্ছিলেন যে, জীবন পুষ্পশয্যা নয়, জীবন হলো একটি কণ্টকাকীর্ণ খেলার মাঠ, যেখানে পদে পদে কান ধরে উঠবস করতে হয়। আজ যদি তারা এই শিক্ষাটা না পায়, কাল যখন বড় হয়ে বসের ঝাড়ি খেয়ে বা গার্লফ্রেন্ডের কাছে সরি বলতে গিয়ে কান ধরতে হবে, তখন তো তারা অনভ্যস্ততায় কোমরে ব্যথা পাবে। সর্বমিত্র আসলে তাদের ইমিউন সিস্টেম বুস্ট করছিলেন।
কিন্তু হায়, সমাজ আজ বড়ই নিষ্ঠুর। ফেসবুকে ভিডিওটি ভাইরাল হতেই শুরু হলো হইচই। কেউ কেউ বললেন, “আহা রে, মাসুম বাচ্চা!” কেউ কেউ আবার মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে লম্বা লম্বা স্ট্যাটাস প্রসব করতে লাগলেন। তাদের বক্তব্য, শিশুদের নাকি এভাবে শাস্তি দেওয়া যায় না। আরে ভাই, শাস্তি কে বলল? এটা তো ছিল ‘ফিজিক্যাল এডুকেশন ক্লাস’। একটা ভাল জিমনেসিয়ামে মেম্বার হতে কত টাকা লাগে জানেন? আর সর্বমিত্র সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, নিজের পকেটের ক্যালরি খরচ করে এই সার্ভিস দিচ্ছিলেন। অথচ কৃতজ্ঞতা তো দূরের কথা, উল্টো তাকে ভিলেন বানানো হলো। ছোটবেলায় মা-খালারা কান মলে দিত না? সেটা যদি ভালোবাসা হয়, তবে সর্বমিত্রের কান মলা কেন নির্যাতন হবে? এটা তো দ্বিমুখী আচরণ!”
চাপে পড়ে সর্বমিত্র চাকমা পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন। তার এই পদত্যাগপত্রটি আসলে কোনো পরাজয়ের দলিল নয়, এটি হলো এই সমাজের প্রতি এক করুণ চপেটাঘাত। তিনি তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই দুঃখ কি তার নিজের কাজের জন্য? নাকি এই সমাজের মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যদশা দেখে? তিনি হয়তো মনে মনে ভাবছেন, “আমি চেয়েছিলাম তোদের মানুষ করতে, আর তোরা আমাকেই অমানুষ বানালি!” পদত্যাগের খবর শুনে মধুর ক্যান্টিনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ডাকসুর জিএস ফরহাদ সাহেব বলেছেন, তিনি এখনো লিখিত পদত্যাগপত্র পাননি। অর্থাৎ, এখনো একটা আশা আছে। হয়তো জাতি তার ভুল বুঝতে পেরে আবার সর্বমিত্রকে ডেকে বলবে, “ফিরে এসো হে কানমলা-রাজ! আমাদের সন্তানদের কান তোমার অপেক্ষায়!”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনার পর খেলার মাঠের ইকোসিস্টেমে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। কান ধরে ব্যায়াম করার ডিডিওতে নিজেদের দেখার ভয়ে শিশুরা এখন আর মাঠে যাবে না। তারা ঘরে বসে পাবজি আর ফ্রি ফায়ার খেলবে। ফলে তাদের চোখ নষ্ট হবে, ঘাড় ব্যথা হবে। তখন এই সমাজের মানুষই আবার বলবে, “বাচ্চারা কেন মাঠে যায় না?” তখন কি সর্বমিত্রের কথা মনে পড়বে না? তখন কি মনে হবে না যে, আমাদের একজন নেতা ছিলেন যিনি লাঠি হাতে তাদের মাঠে ওয়েলকাম জানাতেন? সর্বমিত্রের পদত্যাগের ঘোষণা আমাদের দেখিয়ে দিল যে, আমরা আসলে সৃজনশীল লিডারশিপের জন্য এখনো প্রস্তুত নই। আমরা সেই গদবাঁধা নিয়মেই চলতে চাই।
সর্বমিত্রের অতীত রেকর্ড ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি বরাবরই একজন ‘অ্যাকশন ওরিয়েন্টেড’ মানুষ। এর আগে তিনি ক্যাম্পাস থেকে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করেছিলেন। তখনো তিনি লাঠি হাতেই মাঠে নেমেছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, মুখের কথার চেয়ে লাঠির আওয়াজ অনেক বেশি সুরেলা এবং কার্যকরী। তিনি চেয়েছিলেন ক্যাম্পাসকে ঝকঝকে তকতকে বানাতে, অনেকটা সিঙ্গাপুরের মতো। গরিব দোকানিদের উচ্ছেদ করে তিনি তাদের আসলে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রেরণা দিচ্ছিলেন। হয়তো তিনি চেয়েছিলেন তারা বিল গেটস বা ইলন মাস্কের মতো উদ্যোক্তা হোক, রাস্তার পাশে পিঠা বিক্রি করে জীবন নষ্ট না করুক। তার এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা বোঝার মতো আইকিউ কি আমাদের আছে?
তথাকথিত নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা বলছেন এটা নাকি গর্হিত অপরাধ। তারা বলছেন শিশুদের ট্রমা হতে পারে। কিন্তু ভেবে দেখুন, এই শিশুরা যখন বড় হবে, তখন তারা গর্ব করে বলতে পারবে, “আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ডাকসু নেতার হাতে কান ধরে উঠবস করেছি।” এটা কি তাদের সিভিতে একটা আলাদা ওয়েট যোগ করবে না? “এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ: সফলভাবে ৫০টি কানধরে উঠবস সম্পন্ন করা”।
শেষমেশ, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। সর্বমিত্র হয়তো জবাব দেবেন। কিন্তু এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কি একজন সমাজসেবকের আসল উদ্দেশ্য হারিয়ে যাবে? খেলার মাঠ এখন শূন্য। লাঠিটি হয়তো কোনো এক কোণায় অবহেলায় পড়ে আছে।
ভবিষ্যতে হয়তো এই খেলার মাঠে ‘সর্বমিত্র স্মৃতি কানমলা কর্নার’ নামে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠবে। সেখানে লেখা থাকবে, “এখানে একদা শিশুদের কান ধরে উঠবস করানো হতো, শুধুমাত্র তাদের ভালোর জন্য।” আর আমরা, যারা আজ সমালোচনা করছি, তারা হয়তো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলব, “আহা! কী দিন ছিল!” তাই আসুন, সমালোচনার চশমা খুলে একটু সর্বমিত্রের দৃষ্টি দিয়ে দেখি। তিনি তো চেয়েছিলেন একটি ডিসিপ্লিনড জাতি। তিনি চেয়েছিলেন, খেলার মাঠে শিশুরা শুধু খেলবে না, তারা শিখবে আনুগত্য, তারা শিখবে সহিষ্ণুতা। আর এই শিক্ষার ফি হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন মাত্র কয়েক ফোঁটা চোখের পানি আর একটুখানি দৈহিক কসরত। এটা কি খুব বেশি চাওয়া ছিল? জাতি হিসেবে আমরা কি বড্ড বেশি অকৃতজ্ঞ হয়ে যাচ্ছি না?
পরিশেষে বলা যায়, সর্বমিত্র চাকমা হয়তো পদত্যাগ করবেন, কিন্তু তিনি আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠায়, কিংবা কানের লতিতে, চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন। তার দেখানো পথে হেঁটে হয়তো একদিন আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ব, যেখানে প্রতিটি খেলার মাঠে একজন করে সর্বমিত্র থাকবেন, হাতে থাকবে একটি করে ন্যায়ের দণ্ড, আর বাতাসে ভাসবে কান ধরে উঠবস করার ছান্দিক শব্দ। সেই সোনালি দিনের অপেক্ষায় আমরা আপাতত কান খাড়া করে রইলাম।