দেশে চলছে তীব্র গ্যাস সংকট, আর এর সুযোগে পাচার হচ্ছে অর্থ, ড. ইউনূসের প্রত্যক্ষ মদদে ৫০ হাজার কোটি টাকা লোপাট।
বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক কার্টুনুস: বাংলাদেশে বর্তমানে এক অদ্ভুত জাদুকরী সময় চলছে, যাকে পোশাকি ভাষায় বলা হচ্ছে ‘সংস্কারকাল’। এই সংস্কারের ঠেলায় সবকিছু এতটাই সোজা হয়ে যাচ্ছে যে, বাঁকা জিনিসের আর অস্তিত্ব থাকছে না, এমনকি রান্নার চুলায় যে বাঁকা পাইপ দিয়ে গ্যাস আসত, সেই গ্যাসও এখন সোজা হয়ে আকাশের উড়ে গেছে। আগে মানুষ জানত গ্যাস একটি দাহ্য পদার্থ, যা দিয়ে রান্না হয়। কিন্তু বর্তমানের ‘মহা সংস্কারক’ এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা জাতিকে নতুন এক পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ শেখাচ্ছেন। এখন গ্যাস আর দাহ্য পদার্থ নয়, গ্যাস হলো একটি ‘বিমূর্ত ধারণা’। এটি পাইপলাইনে থাকে না, সিলিন্ডারে থাকে না, এটি থাকে শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। আর এই অদৃশ্য গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে জনগণের পকেট থেকে যে টাকা উধাও হচ্ছে, তা দিয়ে অনায়াসেই আরেকটি পদ্মা সেতু বানিয়ে ফেলা যেত। তবে সেই টাকা এখন ‘সংস্কার ফি’ হিসেবে অদৃশ্য ভল্টে জমা হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকা এখন এক বিশাল ম্যারাথন ট্র্যাকে পরিণত হয়েছে। সকাল হলেই কাঁধে খালি সিলিন্ডার নিয়ে দৌড় শুরু করেন হাজারো মানুষ। অলিম্পিকে মশাল দৌড় হয়, আর ঢাকায় হয় সিলিন্ডার দৌড়। মোহাম্মদপুরের রবিন হাসান নামের এক ভুক্তভোগী তো বলেই ফেললেন, তিনি এখন আর নিজেকে মানুষ ভাবেন না, নিজেকে মনে করেন একজন ‘সিলিন্ডার বাহক’। মাসে এক হাজার আশি টাকা তিতাসের বিল দিয়েও তিনি চুলায় আগুনের দেখা পান না। উল্টো আড়াই হাজার টাকা দিয়ে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস কিনতে হয়। এই যে ডাবল খরচ, এটাকে সংস্কারকরা বলছেন ‘অর্থনীতির বহুমুখীকরণ’। অর্থাৎ, এক পকেট দিয়ে টাকা যাবে সরকারি কোষাগারে, আরেক পকেট দিয়ে যাবে সিন্ডিকেটের পকেটে। মাঝখান থেকে জনগণের পকেট হবে গড়ের মাঠ। রবিন হাসানের মতো লাখো মানুষ এখন এই গড়ের মাঠে দাঁড়িয়ে আকাশ পানে চেয়ে আছেন, যদি কোনো দৈববাণীতে চুলায় আগুন জ্বলে।
ওদিকে জ্বালানি উপদেষ্টা বলছেন, শীতে নাকি গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়, আর সাগরে নাকি জাহাজ পাওয়া যায় না। অথচ পাবলিকের প্রশ্ন, সাগরে জাহাজ পাওয়া যায় না, নাকি সাগরের সব জাহাজ এখন সংস্কারের কাজে ব্যস্ত? গ্যাসের অভাবে যখন ঢাকাবাসী বিদ্যুৎ চালিত চুলার দিকে ঝুঁকছে, তখন বিদ্যুতের মিটারেও ভুতুড়ে বিলের আনাগোনা। অর্থাৎ, ডাঙায় বাঘ আর জলে কুমিরের মতো অবস্থা, চুলায় গ্যাস নেই, সকেটে বিদ্যুৎ বিলের শক। শ্যামলীর রওনক জাহান তো বলেই দিলেন, তিনি এখন আর রান্না করেন না, তিনি এখন ‘অপেক্ষা’ করেন। গ্যাস আসার অপেক্ষা, সিলিন্ডার পাওয়ার অপেক্ষা, আর দাম কমার অপেক্ষা। তার মতে, এই অপেক্ষা করাটাই এখন জাতীয় কাজ। বারো কেজির সিলিন্ডারের গায়ের দাম তেরোশো টাকা, কিন্তু বাজারে সেটি বাইশ শো থেকে পঁচিশ শো টাকা। এই যে মাঝখানের হাজার টাকার ব্যবধান, এটাকে সংস্কারের ভাষায় বলা হচ্ছে ‘সিস্টেম লস’ বা অদৃশ্য উন্নয়ন কর।
জনগণ যখন হাহাকার করছে, তখন তথাকথিত সংস্কারকরা ব্যস্ত আছেন নতুন নতুন তত্ত্ব দিতে। তাদের মতে, গ্যাসের সংকট আসলে সংকট নয়, এটি হলো কৃচ্ছ্রসাধনের মহড়া। বেশি রান্না করলে বেশি খেতে হয়, বেশি খেলে স্বাস্থ্য খারাপ হয়। তাই গ্যাস বন্ধ রেখে সরকার আসলে জনগণের স্বাস্থ্যের যত্ন নিচ্ছে। কী চমৎকার যুক্তি! এই যুক্তির আড়ালে গত কয়েক মাসে জনগণের পকেট থেকে নাই হয়ে গেছে প্রায় পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা। এই টাকাটা কোথায় গেল? এটা কি বাতাসে মিলিয়ে গেল, নাকি কোনো বিশেষ ভবনের বিশেষ ড্রয়ারে জমা হলো, তা নিয়ে গবেষণা করতে গেলে হয়তো আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, আর সেই কমিটির চা-নাস্তার বিল মেটাতে গ্যাসের দাম আরও এক দফা বাড়ানো হবে।
মজার ব্যাপার হলো, এলপিজি ব্যবসায়ীরা যখন ধর্মঘট ডাকলেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে হলো, যাক, এবার বুঝি একটা ফয়সালা হবে। কিন্তু ফয়সালা তো হলোই না, উল্টো ধর্মঘটের অজুহাতে সিলিন্ডারের দাম আরও এক লাফে আকাশে উঠল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা সাপ্লাই পাচ্ছেন না। ডিলাররা বলছেন, কোম্পানি দিচ্ছে না। আর কোম্পানি বলছে, ডলার নেই। এই ‘নেই’ এর রাজ্যে শুধু একটাই জিনিস আছে, তা হলো সংস্কারের নামে লুটপাট। সাধারণ মানুষ যখন দুই হাজার পাঁচশো টাকা দিয়েও সিলিন্ডার পাচ্ছে না, তখন কালোবাজারে ঠিকই গ্যাস মিলছে তিন হাজার টাকায়। অর্থাৎ, টাকা থাকলে গ্যাসের অভাব নেই, অভাব শুধু ন্যায়ের আর দেখার চোখের।
মিরপুরের শেওরাপাড়ার সুরাইয়া সেঁজুতি দুপুরের রান্না বসিয়েছিলেন, হঠাৎ গ্যাস শেষ। তিনি রিকশা নিয়ে পুরো এলাকা চষে বেড়ালেন, কিন্তু সিলিন্ডার নেই। শেষে এক দোকানে পেলেন, দাম বত্তি ৩২৫০ টাকা। এই যে রিকশা ভাড়া, সময়ের অপচয় আর বাড়তি দাম, এসবের হিসাব কে রাখবে? কেউ রাখবে না। কারণ, এখন হিসাব রাখার সময় নয়, এখন ইতিহাস মোছার সময়। তথাকথিত আগের চোরদের সরিয়ে তাদের চেয়ে ১০ গুন বড় নতুন চোরদের বসানোর নামই যদি হয় সংস্কার, তবে সেই সংস্কারের আগুনে জনগণ যে পুড়ে ছাই হচ্ছে, তা দেখার কেউ নেই।
পাইপলাইনের গ্যাসের অবস্থাও তথৈবচ। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য গ্যাস থাকবে না। কিন্তু এই রক্ষণাবেক্ষণ কাজ যেন আর শেষই হয় না। বছরজুড়ে চলে পাইপ মেরামতের নাটক, আর ওদিকে গ্যাসের প্রেসার থাকে শূন্য। কিন্তু মাস শেষে বিলের কাগজে কোনো শূন্য থাকে না, সেখানে পুরো টাকাই দিতে হয়। এটাকে বলা যায় বাতাস খাওয়ার ফি। জনগণ পাইপ দিয়ে বাতাস খাচ্ছে আর টাকা দিচ্ছে। এমন অভিনব ব্যবসা পৃথিবীতে আর কোথাও আছে কি না সন্দেহ।
ডক্টর ইউনূসের নেতৃত্বে এই যে নব্য লুণ্ঠনতন্ত্র কায়েম হয়েছে, তার প্রধান হাতিয়ার হলো এই কৃত্রিম সংকট। এলপিজি গ্যাস আমদানির নামে যে সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে, তারা জানে, মানুষের পেটে ক্ষুধা থাকলে তারা যেকোনো দামে গ্যাস কিনবে। তাই তারা প্রথমে গ্যাস আটকে দেয়, তারপর দাম বাড়ায়, শেষে ওটাকেই ‘বাজার দর’ বলে চালিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় গত কয়েকমাসে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়া হয়েছে। আগে শুনতাম ব্যাংক লুট হয়েছে, এখন দেখছি রান্নাঘরও লুট হচ্ছে। মানুষের ভাতের হাড়ি জিম্মি করে টাকা কামানোর এই নিনজা টেকনিক দেখে শয়তানও হয়তো লজ্জা পাবে।
রামপুরা, মগবাজার, কুড়িল এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গ্যাসের দোকানগুলো বন্ধ। কেন বন্ধ? কারণ গ্যাস নেই। কিন্তু দোকানের পেছনের দরজা দিয়ে ঠিকই ডাবল দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। এই যে কৃত্রিম সংকট, এটা তৈরি করা হয়েছে যাতে মানুষ হাহাকার করে এবং যেকোনো মূল্যে গ্যাস কিনতে বাধ্য হয়। আর এই সুযোগে লুটপাটকারীরা তাদের পকেট ভারী করছে। জনগণ যখন এই লুটেরা বাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলতে চায়, তখন তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয় নতুন কোনো ইস্যু। কখনো ক্রিকেট, কখনো ভারত, আবার কখনো গণভোট। মানুষ যখন সেই তর্কে ব্যস্ত থাকে, তখন রান্নাঘর থেকে সিলিন্ডার নাই হয়ে যায়।
সংস্কারের নামে এই যে অরাজকতা, এর শেষ কোথায়? আমদানিকারকরা বলছেন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কথা। কিন্তু বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম কমলেও বাংলাদেশে কেন বাড়ে? এর উত্তর কোনো অর্থনীতিবিদের কাছে নেই, আছে শুধু লুটতরাজবিদদের কাছে। তারা জানেন, কীভাবে এক টাকার পণ্য দশ টাকায় বিক্রি করতে হয়। আর এই বাড়তি নয় টাকা কোথায় যায়, তা বলাই বাহুল্য। এই টাকা দিয়েই হয়তো বিদেশে সেকেন্ড হোম তৈরি হয়, কিংবা সুইস ব্যাংকের ভল্ট ভরে ওঠে।
শেষমেশ, জনগণের কপালে জুটছে শুধু দীর্ঘশ্বাস আর ঠাণ্ডা ভাত। কেউ কেউ আবার আদিম যুগে ফিরে গিয়ে কাঠের চুলায় রান্না করছেন। রাজধানী ঢাকার বুকে কাঠের ধোঁয়া উড়ছে, আর সেই ধোঁয়ার আড়ালে ঢাকা পড়ছে সংস্কারের নামে চলা এই মহালুটপাট।
[…] […]